1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ১১:২১ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
মাদক সম্রাট কাজল গ্রেপ্তার: স্বস্তিতে চুনারুঘাট পৌরবাসী  ফ্যামিলি কার্ড: মানুষের অধিকার, নাকি নতুন অনিয়মের দরজা? নিয়োগ বঞ্চিতদের ক্ষোভে উত্তাল বানিয়াচং : লাঞ্চিত ইউএনও- ফলাফল বাতিলের দাবি চুনারুঘাটে ৫০ কেজি গাঁজা সহ তিন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার  নিজ মাতৃভূমিতেই আমরা কেন নিরাপদ নই? নিরাপত্তাহীনতার বেদনায় রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের আত্মজিজ্ঞাসা হাজী রশিদ-হামিদ মডেল হাই স্কুল থেকে ইয়ারমিনের জিপিএ-৫ অর্জন: জারুলিয়ায় আনন্দের জোয়ার শিশুকে যেভাবে বইয়ে আগ্রহী করে তুলবেন ১১৫০ নম্বরের সাফল্য অর্জন করেছে রাজার বাজার স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষার্থী লাইসা হুসাইন সীমান্তের কাঁটাতার, রক্তের স্মৃতি ও নীরব অস্তিত্ব রক্ষা: গজরাজের না-বলা কথা রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করার নির্দেশনা

ফ্যামিলি কার্ড: মানুষের অধিকার, নাকি নতুন অনিয়মের দরজা?

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ। রাষ্ট্রের সহায়তা প্রকৃত দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো এবং নারীর হাতে পরিবারের সহায়তার নিয়ন্ত্রণ দেওয়া—এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হলে কর্মসূচিটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। সরকারি নীতিতে নির্ধারিত পরিবারের নারী প্রধানের নামে কার্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং কার্ড পাওয়ার জন্য কোনো অর্থ নেওয়ার বিধান নেই। রাষ্ট্রীয় সহায়তা বিতরণে প্রচলিত অনিয়ম দূর করাও এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।

কিন্তু কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে যে অভিযোগগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সামনে এসেছে, সেগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ যে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য অনিয়ম কমানো, সেই কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ থেকেই যদি অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—ফ্যামিলি কার্ড কি পুরোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অনিয়ম দূর করবে, নাকি নতুন একটি স্তরের অনিয়মের জন্ম দেবে?

এখানে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সংবাদে প্রকাশিত অভিযোগকে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। কোথাও প্রশাসন অভিযোগ অস্বীকার করেছে, কোথাও তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক সংগঠন নিজস্ব অনুসন্ধানে ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে প্রতিটি ঘটনাকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে, যতক্ষণ না তদন্ত বা আইনগত প্রক্রিয়ায় তা প্রমাণিত হয়। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বারবার উঠতে থাকে, তখন সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সরকারি দপ্তরে তালা দিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসবই অভিযোগ এবং এগুলো প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায়ও ফ্যামিলি কার্ড শুমারির কর্মী নিয়োগ ঘিরে স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও অর্থের বিনিময়ে কয়েকজন নিয়োগ পেয়েছেন। এর প্রতিবাদে ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের বিষয়; কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটিই এখানে বড় উদ্বেগ।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও বা অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। কুড়িগ্রামের উলিপুরেও জনবল নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া এবং যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। গাইবান্ধার তিন উপজেলায় একই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের খবর এসেছে।

অন্যদিকে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার ঘটনা কিছুটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। ১৪টি ইউনিয়নে ১২৬ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ১৪ জন সুপারভাইজার নিয়োগের পর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ১২ আগস্ট স্থানীয় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা নিয়োগ বাতিল করে পুনর্নিয়োগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করেই নিয়ম মেনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে প্রশাসনের বক্তব্যও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। কারণ অভিযোগ ওঠা আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।

সিলেট অঞ্চলের ঘটনাগুলো আরও বেশি উদ্বেগের কারণ। দক্ষিণ সুরমা, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও জকিগঞ্জ—একাধিক উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের মাঠকর্মী নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, অযোগ্যদের নিয়োগ কিংবা পরীক্ষার ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিক্ষোভ হয়েছে। দক্ষিণ সুরমায় ৬৯ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ছয়জন সুপারভাইজার নিয়োগের পর অনিয়মের অভিযোগে ইউএনও কার্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও বালাগঞ্জেও একই ধরনের অভিযোগে বিক্ষোভের খবর এসেছে। জকিগঞ্জে নিয়োগের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সরকারি কার্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে; সেখানে পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও তালিকায় নাম আসার অভিযোগ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের একাধিক অঞ্চলে একই ধরনের অভিযোগ কেন উঠছে?

সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হলো—একটি বড় কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে জনবল নিয়োগের স্বচ্ছতা যথেষ্ট দৃশ্যমান না হলে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়। একজন তথ্য সংগ্রহকারীই যদি কোনো পরিবারের তথ্য গ্রহণ করেন, তাহলে তিনি বাস্তবে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারেন। একজন সুপারভাইজার যদি সেই তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকেন, তাহলে তাঁর নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই দুটি স্তরে নিয়োগে সামান্য সন্দেহও পুরো কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় একজন প্রার্থী নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, এক ইউনিয়নের প্রার্থীদের অন্য ওয়ার্ডের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এতে আঞ্চলিকতা বা স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউএনও তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। এই ধরনের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করাই হওয়া উচিত। অভিযোগকারীকে রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা কিংবা তাঁর অভিযোগকে আগে থেকেই মিথ্যা বা সত্য ধরে নেওয়া—কোনোটিই সঠিক সাংবাদিকতা বা প্রশাসনিক পদ্ধতি নয়।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। যশোরের কেশবপুরেও অনিয়মের অভিযোগে অবস্থান কর্মসূচির খবর এসেছে। অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবে আলাদা হলেও অভিযোগের ধরন প্রায় একই—নিয়োগে স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাব, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা।

এখানেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতজন মানুষ কার্ড পেলেন, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং কারা কার্ড পেলেন, কারা বাদ পড়লেন, তথ্য কীভাবে যাচাই হলো, কারা তথ্য সংগ্রহ করলেন, কীভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তি হলো এবং সুবিধাভোগীর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হলো কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আর এখানেই নারীকে কেন্দ্র করে কর্মসূচিটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

কার্ড নির্ধারিত পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়ার কথা। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তা সরাসরি নারীর হাতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে অর্থ ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। কিন্তু নারীকে কার্ডের প্রধান সুবিধাভোগী করা হলে তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। স্থানীয় দালাল, রাজনৈতিক কর্মী, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা অসাধু ব্যক্তি যদি মনে করেন যে কার্ড পাওয়ার জন্য নারীদের তাঁর কাছে যেতে হবে, তাহলে রাষ্ট্রের একটি ভালো উদ্যোগ স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হতে পারে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার আলোরূপা মোড় এলাকায় দরিদ্র নারীদের কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগটি এ কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ অনুযায়ী, কার্ডপ্রতি ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল এবং চারজনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠন এক নেত্রীকে বহিষ্কার করেছে। তবে অভিযুক্ত নারী অভিযোগ অস্বীকার করে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। ফলে সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তের। কিন্তু অভিযোগটির গুরুত্ব এখানেই—দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যের একটি রাষ্ট্রীয় সুবিধা যদি কারও কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রির সুযোগ তৈরি করে, তাহলে সেটি শুধু দুর্নীতি নয়, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার ওপর আঘাত।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ফ্যামিলি কার্ড ছাপিয়ে স্থানীয় নারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও একই ধরনের আরেকটি সতর্ক সংকেত। লালমনিরহাটের অন্য একটি এলাকাতেও কার্ড দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের খবর এসেছে।

এখানে সাধারণ মানুষের জন্য একটি বিষয় স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন—রাষ্ট্রীয় ফ্যামিলি কার্ড বিনামূল্যের কর্মসূচি হলে কার্ড পাওয়ার জন্য কাউকে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কোনো ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী, সরকারি কর্মচারী বা স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী যদি কার্ড করে দেওয়ার নামে অর্থ দাবি করেন, তাহলে সেই দাবিকে স্বাভাবিক হিসেবে নেওয়া যাবে না।

আরও উদ্বেগজনক হলো, নারীদের সঙ্গে অশালীন বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ। এমন একটি অভিযোগও সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে। তবে এর নির্ভুল জেলা-উপজেলা পরিচয় ও স্বাধীন যাচাই নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া, কিন্তু যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া নয়।

তারপরও প্রশ্নটি থেকে যায়—নারীরা যখন রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার জন্য মাঠকর্মীদের কাছে নিজেদের পরিবার, আয়, সম্পদ ও ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দেবেন, তখন তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে?

এই প্রশ্নটি শুধু নারী অধিকার নয়, প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও।

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারীর কাজ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য সংগ্রহ নয়, ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগও নয়। এটি একটি সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির তথ্যভিত্তিক কাজ। ফলে নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক পরিচয়, আত্মীয়তা, স্থানীয় প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কর্মসূচির শুরুতেই যদি তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে পরে তৈরি হওয়া সুবিধাভোগীর তালিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। একজন ভুল ব্যক্তিকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাদ পড়তে পারে। আবার কোনো প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাদ পড়লে তার ক্ষতি শুধু একটি কার্ড হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সে রাষ্ট্রের একটি নির্ধারিত সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।

তাই ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে টাকা নয়—বিশ্বাসযোগ্য তথ্য।

যে পরিবার প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র, কিন্তু তথ্য সংগ্রহকারীর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা স্থানীয় প্রভাবের কারণে বাদ পড়ে গেল, তার কাছে রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যর্থ। আবার যে পরিবার যোগ্য নয়, কিন্তু প্রভাব বা অর্থের মাধ্যমে তালিকায় ঢুকে গেল, তার অর্থও প্রকৃত সুবিধাভোগীর অধিকার থেকে নেওয়া হচ্ছে।

এই জায়গায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তথ্য সংগ্রহের প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ, সময়-তারিখসহ তথ্যের রেকর্ড, সংশোধনের ইতিহাস, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর পরিচয় এবং যাচাইয়ের স্তর সংরক্ষণ করা গেলে পরে তদন্ত করা সহজ হবে। একজন কর্মী কোনো পরিবারের তথ্য পরিবর্তন করলে তার রেকর্ড থাকা উচিত। একই পরিবারের তথ্য একাধিকবার পরিবর্তন হলে সেটিও নজরদারির আওতায় আসা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। দরিদ্র মানুষ ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করতে পারবেন না। তাঁদের অভিযোগ ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়েই গ্রহণ করতে হবে। অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার ব্যবস্থা থাকলে আরও বেশি মানুষ অনিয়মের কথা জানাতে পারবেন।

কিন্তু অভিযোগ ব্যবস্থা শুধু কাগজে থাকলেই হবে না। অভিযোগের নিষ্পত্তির সময়সীমাও নির্ধারণ করতে হবে।

কেউ যদি বলেন, “আমার পরিবার যোগ্য অথচ আমাকে তালিকায় রাখা হয়নি”—তাহলে তাঁর অভিযোগ কে শুনবেন? কেউ যদি বলেন, “আমার কাছ থেকে টাকা চাওয়া হয়েছে”—তাহলে প্রাথমিক তদন্ত কে করবেন? কেউ যদি বলেন, “আমার তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে”—তাহলে তথ্যের পুরোনো রেকর্ড কে দেখবেন? আর কোনো মাঠকর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এলে তাঁর দায়িত্ব বহাল থাকবে, নাকি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অন্য কাজে রাখা হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর যত দ্রুত পরিষ্কার হবে, ততই কর্মসূচির ওপর আস্থা বাড়বে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ বাংলাদেশের স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। যে দলের লোক ক্ষমতায় থাকে, তাদের অনুসারীরা বেশি সুবিধা পাবে—এমন ধারণা তৈরি হলে দরিদ্র মানুষ রাষ্ট্রীয় সুবিধাকে অধিকার হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক অনুগ্রহ হিসেবে দেখতে শুরু করে। এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

ফ্যামিলি কার্ড কারও রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় নীতির আওতায় নির্ধারিত যোগ্য পরিবারের অধিকার।

এ কারণে কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা যদি বলেন, “আমার তালিকার মানুষকে কার্ড দিতে হবে”—তাহলে প্রশাসনের দায়িত্ব হবে সেই তালিকার বাইরে নির্ধারিত সরকারি মানদণ্ড অনুসরণ করা। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের অভিযোগ উঠলেই প্রশাসনকে তা অগ্রাহ্য করা উচিত নয়। অভিযোগকারী কোন দলের তা নয়, অভিযোগের মধ্যে তথ্য ও প্রমাণ আছে কি না—সেটিই হওয়া উচিত বিবেচনার বিষয়।

নবাবগঞ্জে প্রশাসন নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দক্ষিণ সুরমাতেও ইউএনও যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের কথা বলেছেন। এসব বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ মুক্তমত কলামে প্রশাসনকে একতরফাভাবে অভিযুক্ত করা নয়, বরং অভিযোগ ও প্রশাসনের বক্তব্য—দুই পক্ষকেই সামনে রাখা উচিত।

তবে প্রশাসনের বক্তব্যের পর তদন্তের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। বরং অভিযোগ উঠলে তদন্ত আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত।

প্রয়োজনে নিয়োগ পরীক্ষার নম্বর, মেধাক্রম, আবেদনকারীর সংখ্যা, নির্বাচিতদের যোগ্যতা এবং নিয়োগের মানদণ্ড প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে অভিযোগের বড় একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। একজন প্রার্থী কেন নির্বাচিত হলেন, আর অন্যজন কেন বাদ পড়লেন—এটি যদি নথিতে স্পষ্ট থাকে, তাহলে রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ যাচাই করাও সহজ হবে।

ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—তথ্য সংগ্রহকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ।

কারণ একটি পরিবার সম্পর্কে ভুল তথ্য নেওয়া মানে শুধু একটি ফর্মে ভুল করা নয়। পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়, পেশা, সম্পদ, প্রতিবন্ধিতা, নারী প্রধানের অবস্থা, নির্ভরশীল সদস্য, বাসস্থানের অবস্থা—এসব তথ্যের ওপর ভবিষ্যৎ সুবিধা নির্ভর করতে পারে। তাই তথ্য সংগ্রহকারীকে শুধু একটি অ্যাপ বা ফরম পূরণ শেখালে হবে না; তাঁকে তথ্যের গোপনীয়তা, নারীর সঙ্গে আচরণ, শিশু ও প্রবীণের তথ্য সংগ্রহ, হয়রানি প্রতিরোধ এবং স্বার্থের সংঘাত সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

বিশেষ করে নারী প্রধানের সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের সময় কোনো ধরনের ব্যক্তিগত মন্তব্য, অশালীন ইঙ্গিত, অনৈতিক প্রস্তাব বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের চাপ যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর আচরণবিধি প্রয়োজন।

যদি কোনো কর্মী মনে করেন যে দরিদ্র নারীর অসহায়ত্ব তাঁর ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ, তাহলে সেটি শুধু একজন নারীর প্রতি অন্যায় নয়; পুরো কর্মসূচির উদ্দেশ্যের বিরোধী।

সরকার যে কর্মসূচির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করতে চায়, সেখানে নারীকে হয়রানি বা অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে সেটি সরকারের জন্যও সতর্কবার্তা।

আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যকে সংবাদ হিসেবে গ্রহণের আগে যাচাই করা।

ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে মানুষের আগ্রহ ও উদ্বেগ অনেক বেশি। ফলে একটি ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও বা অডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেখানে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা কিংবা নারীকে অশালীন প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেশি। অভিযোগটি কে করেছেন, ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে, কখন ঘটেছে, কোনো লিখিত অভিযোগ আছে কি না, প্রশাসন কী বলেছে, অভিযুক্ত কী বলেছেন—এসব যাচাই না করে কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগ বলে সবকিছুকে অগ্রাহ্য করাও ভুল। অনেক সময় মূল ঘটনা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রকাশ পায়। এরপর সাংবাদিকের কাজ হলো সেটিকে যাচাই করা।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বর্তমান ঘটনাগুলো আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়—বড় রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি যত ভালোই হোক, মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন দুর্বল হলে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নাটোর, লালমনিরহাট থেকে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা থেকে ঢাকা, সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ, মেহেরপুর থেকে যশোর—বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগগুলো এসেছে, সেগুলোকে একসঙ্গে দেখলে একটি প্রবণতা চোখে পড়ে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার আসছে তিনটি বিষয়—নিয়োগের স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থ লেনদেনের সন্দেহ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং প্রতারণার ঘটনা।

এখন রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ।

প্রথম পথ হলো—এসবকে স্থানীয় বিক্ষোভ, রাজনৈতিক বিরোধ বা বিচ্ছিন্ন অভিযোগ হিসেবে দেখে এগিয়ে যাওয়া।

দ্বিতীয় পথ হলো—অভিযোগগুলোকে কর্মসূচির দুর্বলতা শনাক্ত করার সুযোগ হিসেবে দেখা।

দ্বিতীয় পথটিই হওয়া উচিত।

কারণ একটি নতুন কর্মসূচি শুরু হওয়ার সময়ই যদি কোথাও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে শুরুতেই তা বন্ধ করা সহজ। পরে একটি বিশাল সুবিধাভোগী তালিকা, হাজার হাজার তথ্য সংগ্রহকারী এবং লাখ লাখ পরিবারের তথ্যের মধ্যে অনিয়ম শনাক্ত করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

আমার মতে, ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে এখনই কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রথমত, সব নিয়োগের মানদণ্ড ও মেধাক্রম প্রকাশ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিয়োগে অভিযোগ থাকলে স্বাধীন বা অন্তত বহুপক্ষীয় তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত, তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারের পরিচয় স্থানীয়ভাবে দৃশ্যমান করতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি ভুয়া পরিচয়ে মানুষের কাছে যেতে না পারেন।

চতুর্থত, কার্ড সম্পূর্ণ বিনামূল্যের—এ কথা প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রামে প্রচার করতে হবে।

পঞ্চমত, টাকা দাবি করলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে, সেই নম্বর ও পদ্ধতি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

ষষ্ঠত, নারী সুবিধাভোগীদের সঙ্গে আচরণের জন্য কঠোর আচরণবিধি করতে হবে।

সপ্তমত, কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সুপারিশ যেন সরকারি নিয়োগ বা সুবিধাভোগী নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

অষ্টমত, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

নবমত, মাঠকর্মীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে।

দশমত, সুবিধাভোগী তালিকা তৈরির পর সামাজিক নিরীক্ষা বা স্থানীয় পর্যায়ে যাচাইয়ের সুযোগ রাখা যেতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—রাষ্ট্র কি দরিদ্র মানুষকে তার অধিকার হিসেবে সহায়তা দিতে পারছে, নাকি স্থানীয় ক্ষমতাবানদের অনুমোদনের ওপর তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে?

একজন দরিদ্র নারী যদি কার্ড পাওয়ার জন্য কারও কাছে টাকা দিতে বাধ্য হন, তাহলে রাষ্ট্রীয় সহায়তা আর অধিকার থাকে না; সেটি হয়ে যায় কেনাবেচার বস্তু।

একজন যোগ্য প্রার্থী যদি তথ্য সংগ্রহকারীর চাকরি না পান কারণ তিনি কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নন, তাহলে নিয়োগ ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

একজন অযোগ্য ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থের মাধ্যমে নিয়োগ পান, তাহলে তাঁর হাতে রাষ্ট্রীয় তথ্যের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়।

আর কোনো নারী যদি সরকারি সুবিধা পাওয়ার আশায় কোনো কর্মীর কাছ থেকে অশালীন ইঙ্গিত বা অনৈতিক প্রস্তাব পান, তাহলে সেখানে শুধু একজন কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়—রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

ফ্যামিলি কার্ড তাই কেবল একটি কার্ড নয়। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার একটি নতুন সম্পর্ক তৈরির পরীক্ষা।

এই পরীক্ষায় প্রশাসনকে যেমন কঠোর হতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। অভিযোগ উঠলেই প্রশাসনিক কার্যালয়ে তালা, ঘেরাও বা ভাঙচুর কোনো সমাধান নয়। আবার প্রশাসনের পক্ষ থেকেও “নিয়ম মেনেই হয়েছে” বললেই অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। প্রয়োজন নথি, স্বচ্ছতা, তদন্ত এবং জবাবদিহি।

গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। সংবাদমাধ্যমকে একদিকে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরতে হবে, অন্যদিকে নির্দোষ ব্যক্তিকে অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে। অভিযোগকারী, প্রশাসন এবং অভিযুক্ত—তিন পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ করে সংবাদ প্রকাশ করতে হবে। বিশেষ করে নারী হয়রানি বা যৌন ইঙ্গিতের অভিযোগে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।

সবশেষে বলতে হয়, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির ধারণাটি খারাপ নয়; বরং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এটি দরিদ্র পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে। সমস্যা কর্মসূচির উদ্দেশ্যে নয়, সমস্যা বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে।

আজ যে অভিযোগগুলো বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসছে, সেগুলোকে সরকার চাইলে একটি আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তদন্ত করে অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে, মিথ্যা হলে তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। এতে প্রশাসনের ভাবমূর্তিই শক্তিশালী হবে।

কারণ দুর্নীতি ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি শুধু দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দেওয়া নয়; এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগই কম থাকে।

ফ্যামিলি কার্ড যদি সত্যিই রাষ্ট্রীয় সহায়তা বণ্টনের পুরোনো অনিয়ম দূর করার কর্মসূচি হয়, তাহলে তার প্রথম শর্ত হওয়া উচিত—নিয়োগে স্বচ্ছতা, তথ্যের নির্ভুলতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, নারীর মর্যাদা এবং শূন্য সহনশীলতার জবাবদিহি।

দরিদ্র মানুষের হাতে রাষ্ট্রের সহায়তা পৌঁছাবে—এটাই ফ্যামিলি কার্ডের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন যেন কোনো স্থানীয় দালাল, রাজনৈতিক প্রভাবশালী, অসাধু কর্মী কিংবা ঘুষের টাকার কাছে আটকে না যায়।

ফ্যামিলি কার্ডের আসল সাফল্য তখনই, যখন একজন দরিদ্র নারী কারও কাছে মাথা নত না করে, কোনো টাকা না দিয়ে, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার না করে নিজের অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রের সহায়তা পাবেন।

রাষ্ট্রের কাছে সেই নিশ্চয়তাটিই আজ সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ। রাষ্ট্রের সহায়তা প্রকৃত দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো এবং নারীর হাতে পরিবারের সহায়তার নিয়ন্ত্রণ দেওয়া—এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হলে কর্মসূচিটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। সরকারি নীতিতে নির্ধারিত পরিবারের নারী প্রধানের নামে কার্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং কার্ড পাওয়ার জন্য কোনো অর্থ নেওয়ার বিধান নেই। রাষ্ট্রীয় সহায়তা বিতরণে প্রচলিত অনিয়ম দূর করাও এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।

কিন্তু কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে যে অভিযোগগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সামনে এসেছে, সেগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ যে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য অনিয়ম কমানো, সেই কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ থেকেই যদি অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—ফ্যামিলি কার্ড কি পুরোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অনিয়ম দূর করবে, নাকি নতুন একটি স্তরের অনিয়মের জন্ম দেবে?

দ.ক.সি.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews