অজয় বিশ্বাস: অন্যদিকে এই আন্দোলনে যোগ হয়েছিল মানুষের স্বতসফুর্ত আবেগ যা একধরনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রূপ নেয়। এসবের প্রকাশ ছিল গ্রাফিতি, র্যাপ সংগীত এবং প্রতিবাদী স্লোগানের মধ্যে। ফলে আন্দোলনটি হয়ে ওঠে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অবয়ব, যা সাধারণ মানুষের আবেগকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়।
কিন্তু আন্দোলনের সবচেয়ে দুর্বল দিক ছিল উপযুক্ত নেতৃত্ব বা চেইন অব কমান্ডের অভাব। আন্দোলনটি স্বতস্ফুর্ত ও অরাজনৈতিক হওয়ার কারণে মাঠ পর্যায়ে অনেক সময় সুনির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এসময় সহিংসতা ও ব্যাপক জনসমাগমের কারণে দুস্কৃতকারীদের অনুপ্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই সুযোগ নিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। যার দায়ভার তখন মূল আন্দোলনকারীদের ওপর চাপানো হয়। কিন্তু পরে গণমাধ্যমে তাদের পরিচিতি প্রকাশ পায়। তবে আন্দোলন পরিচালনাকারী নেতারা যে ধোয়া তুলসীপাতা ছিলেন একথাও বলা যাবে না। আন্দোলন পরবর্তীকালে তাদের কর্মকান্ড. বিলাসিতা ও আচরণ জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি করে, যা একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে।
এই আন্দোলনের আরও একটি বড় দুর্বলতা ছিল আন্দোলন পরবর্তী রোডম্যাপের অস্পষ্টতা। সরকার পতনের আগে পর্যন্ত ‘একদফা’দাবি পরিস্কার করা হলেও সরকার পতনের ঠিক পরের সময়টাতে রাষ্ট্র কীভাবে চলবে বা সংস্কারের রূপরেখা কী হবে- তা নিয়ে আন্দোলনের শুরুতে কোনো সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত পরিকল্পনা ছিল না বা কারো কারো কাছে অস্পষ্ট ছিল। এই কারণে জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেউ কেউ আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন এবং বার বার ছাত্রদেরকে সতর্ক করেছেন। আর আন্দোলনের যে মূল আকাঙ্ক্ষা তৃতীয় গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন শক্তির উত্থান তা কার্যত সফল হয়নি। বরং পরবর্তীতে এক অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেশের মানুষকে শংকিত করে তোলে।
মানুষের নিরাপত্তা ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি আন্দোলনের গতি-প্রকৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে আন্দোলন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের অভাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মারমুখী অবস্থানের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, যা এড়ানো সম্ভব হলে আন্দোলনের বিজয় আরও মসৃণ হতো। তাছাড়া আন্দোলনকারীদের ভেতর দুস্কৃতকারীদের অনুপ্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হতো না। এখানে আরও একটি অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংখ্যালঘু ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা, সন্ত্রাস, ভাঙচুর ও মব সন্ত্রাস আন্দোলনের বিজয়কে ম্লান করে দিয়েছে। সরকার পতনের পরবর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বা প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড রোধে আন্দোলনকারীদের কোনো তাৎক্ষণিক কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। বরং দেখা গেছে, আন্দোলনকারীদের সাথে মিশে দৃস্কৃতিকারীরা এসব ঘটনার সাথে জড়িত ছিল। এক্ষেত্রে অন্তবর্তী সরকারের ভুমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
এসব ঘটনার আনুপুর্বিক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে। সামাজিক আন্দোলনের তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সফল আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন সংগঠিত নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট লক্ষ এবং কার্যকর কৌশল। এছাড়া Resource mobilization theory আন্দোলনের সম্পদ ও সংগঠনের গুরুত্ব তুলে ধরে, যেখানে দেখা যায় ২০২৪ সালের আন্দোলনে সংগঠনের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। অন্যদিকে political model অনুযায়ী, রাজনৈতিক সুযোগের সদ্ব্যবহার আন্দোলনের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সকল অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং কতিপয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাভবান হয়।
২০২৪ সালের গণআন্দোলন ছিল একটি জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন, যা একদিকে নাগরিক অংশগ্রহণকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে সহিংসতা ও বিতর্কের মাধ্যমে এর সীমাবদ্ধতাও উন্মোচিত করেছে। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্দোলনের ক্ষেত্রে সংগঠিত কাঠামো, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং কৌশলগত পরিকল্পনা অপরিহার্য। কারণ প্রতিটি আন্দোলনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। আর সেই লক্ষ্য দেশের ও দেশের গণমানুষের। কিন্তু ২০২৪ এর আন্দোলনের পেছনে আরও একটি বিশেষ পরিবর্তন আন্দোলনের পরে প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুন-
২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা (পর্ব-১)
২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা (২য় পর্ব)
২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা (৩য় পর্ব)
২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা (৪র্থ পর্ব)
২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা (৫ম পর্ব)
দেশের বরেণ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র আন্দোলনের এই বিস্ফোরণটি হঠাৎ করে ঘটেনি, বরং বছরের পর বছর ধরে পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও বঞ্চনা তাদের মধ্যে একটি প্রতিবাদী চিন্তা ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিল। এই উন্মুখ মনোভাব এবং প্রস্ততির পেছনে কয়েকটি মূল অনুঘটক কাজ করেছে-
১. বঞ্চনা ও অধিকার হরণের দীর্ঘ ইতিহাস:
দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা সকলেই ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন অনিয়ম, অধিকার হরণ, বিচারিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য দেশের ছাত্র সমাজ ও সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষোভের সঞ্চার করে। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন অথবা ২০১৮ কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন-উভয় ক্ষেত্রেই ছাত্ররা যৌক্তিক দাবি নিয়ে রাজপথে নামে। কিন্তু সেই আন্দোলনগুলো যখন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করা হয় বা প্রতিশ্রুতি দিয়েও পরে দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবারও গভীর ক্ষোভের সঞ্চার করে। তাদের মনে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ছোট ছোট সংস্কারের মাধ্যমে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। চাই একটা আমূল পরিবর্তন।
সমাজবিজ্ঞানী এবং বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান ‘মানসিক ও কৌশলগত ভিত্তি’অথবা প্রেরণা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ রয়েছে:
(চলবে)
দ.ক.সিআর.২৬