
অজয় বিশ্বাস: আগের পর্বে শুধু ২০২৪ সালের ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিত এবং ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিতসার তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে এপর্যন্ত এরকম যুগান্তকারী ঘটনা অর্ভূতপূর্ব। এদেশে স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বহু আন্দোলন হয়েছে। এমন কি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনও। বলা বাহুল্য, এসব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রসমাজ। তারাই ছিল মূল চালিকা শক্তি। প্রতিটি আন্দোলনে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়ার পর বিজয় অর্জিত হয়েছে। আর ছাত্ররা আবার ফিরে গেছে তাদের নিজের বিদ্যাপীঠে। অবশ্য সেই সময় জানা বা দেখার বাইরেও কিছু ছিল।
তাই এবারের জুলাই ছাত্র-গণ আন্দোলনের চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ আন্দোলনের শুরু, আন্দোলন চলাকালে বা বিজয় অর্জনের পর যা কিছু ঘটেছে বা ঘটছে সেগুলো দেশের সকল মানুষেরই চোখের সামনে ঘটছে। এসব ঘটনার খুব কম অংশই মানুষের দৃষ্টির সীমানার বাইরে। তাই এই আন্দোলনে নেতৃত্বপ্রদানকারী ছাত্র-জনতার কি ভূমিকা ছিল। আজ তা স্পষ্ট। স্বৈরাচার হাসিনা সরকার যেমন গণমাধ্যমের চোখ ও মুখ বন্ধ করে রেখেছিল, একইভাবে বিজয় অর্জনের পরও গণমাধ্যমের উপর বিভিন্ন ধরনের চাপ ছিল। সত্য প্রকাশ না করার শর্তে তারা কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। আরও কিছু বৈপারিত্য রয়েছে এবারের বহুল আলোচিত এবং আলোকিত গণজাগরণের সময়।
আওয়ামী লীগ বা ক্ষমতাসীন অন্য সরকারগুলোর সময় গণমাধ্যমের বাক স্বাধীনতা যেভাবে হরণ করা হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাই আমার দেখেছি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অফিস বন্ধ হয়ে যেতে, প্রকাশ্যে হুমকির শিকার হতে, এমনকি কোনো কোনো প্রিন্ট মিডিয়ার অফিস পুড়িয়ে দিতে। এসময় অন্তর্বতীকালীন সরকার, সেনাবাহিনী বা অন্যান্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল নিশ্চুপ এবং কানা ও বধির। এসব কর্মকান্ডের দায় তাদেরই।
আমরা জানি এসব সমাজবিরোধী কাজের ক্ষেত্রে কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায় না। হয়তো দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে পাবে। আর তাই গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে ভোট দিয়েছে। এই ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠা পেয়ে বিএনপি জয়লাভ করেছে। মানুষ এবার তরুণ নেতৃত্বকে বেছে নিয়েছে।
এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। আগেই বলেছি ২০২৪ সালের ছাত্র-গণ আন্দোলন বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বহুমাত্রিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যেমে যেমন মানুষের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ছিল; তেমনি তাদের দাবি-দাওয়া এবং রাজনৈতিক সচেতনতার প্রকাশ ঘটেছে। অন্যদিকে সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কিত বিতর্কও সমানভাবে সামনে এসেছে।
এই দিক থেকে বিবেচনা করলে আন্দোলনটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি বিশেষ সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন বলা যায়। জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেমন জনসম্পৃক্ততা, প্রতিবাদ ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তেমনি সহিংসতা, বিতর্ক ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়া নিয়েও এই আলোচনা। ফলে, বিষয়টি একমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, বরং বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের দাবি থেকে উত্থাপিত। এই লেখায় আন্দোলনের পটভূমি, প্রকৃতি ও জনগণের মধ্যে বিস্তারকৃত প্রভাবের একটি নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা করা প্রয়োজন। এখানে সেই আলোচনার সূত্রপাত করা হলো।
বাংলাদেশের ইতিহাস গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাঙালি জাতির সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথটি মসৃন নয়। কখনও ছিল না। এদেশের মানুষের দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে ইতিহাস রয়েছে। বহুমাত্রিক আন্দোলন হয়েছে বারবার। আর এসব আন্দোলন দেশের ইতিহাসে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের গণআন্দোলন কি একটি জনআকাঙ্ক্ষার স্বতস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ? নাকি একটি জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন? আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ, অংশগ্রহণকারীদের ভুমিকা, (আন্দোলনের সময় ও আগে)। আন্দোলন পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি একক কোনো ব্যাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই বিষয়টির অন্তর্নিহিত সত্য নিরপেক্ষভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখায়।
২০২৪ সালের গণআন্দোলন দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই অংশে আন্দোলনের উদ্ভব, বিস্তার, অংশগ্রহণের ধরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিতর্কসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একইসাথে সামাজিক আন্দোলন তত্ত্বের আলোকে এর কার্যকারিতা, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের চেষ্টাও করা হয়েছে এই লেখায়। এছাড়া দেশের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য ভুমিকা, বিশেষত জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততা নিয়েও নিরপেক্ষ আলোচনা উপস্থাপন করার সুযোগ আছে এই লেখাতে।
গণআন্দোলন একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চেতনা, নাগরিক সক্রিয়তা ও সামাজিক গতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন এক সময় আন্দোলন সংঘটিত হয়, যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং জনমনে অসন্তোষ একটি জটিল বাস্তবতার মুখোমখি সবাইকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। এই আন্দোলনে নাগরিক অংশগ্রহণের একটি নতুন মাত্রা যোগ হলেও, সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং তথ্য বিভ্রান্তির মতো সংগত কারণে এর প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ফলে এটি একটি একমুখী ব্যাখার পরিবর্তে বহুমাত্রিক নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
এই আন্দোলনের উদ্ভবের পেছনে একাধিক কারণ ক্রিয়াশীল ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ ও বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তকে ঘিরে ধীরে ধীরে জনমনে অসন্তোষ সঞ্চিত হতে থাকে। পাশাপাশি তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার আন্দোলনের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।
অন্যদিকে, আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা, সম্পদ বিনষ্ট এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও মতভেদ তৈরি হয়। ফলে একদিকে এই আন্দোলন যেমন গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে উপস্থিত হয়, অন্যদিকে এর পদ্ধতি ও ফলাফল নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
এই আন্দোলনের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এরমধ্যে রাজনৈতিক কারণের মধ্যে রয়েছে ক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতির সংঘাত এবং নীতিগত মতবিরোধ। অর্থনৈতিক কারণের মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অভাব সংক্রান্ত চাপ। আর সামাজিক কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে, তরুণ সমাজের প্রত্যাশা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার দাবি। এই উপাদানগুলো সম্মিলিতভাবে একটি গণআন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
আন্দোলনের গতিশীলতা ও বিস্তার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় আন্দোলনটি ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয়েছে। প্রথমে সীমিত আকারে শুরু হলেও পরে এটি জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। কিন্তু পরে তা সহিংসতার রূপ নেয়। এছাড়া এটি প্রথমে ছিল শহর কেন্দ্রিক। পরে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আরও একটি বিষয় লক্ষনীয়। এই আন্দোলনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এর গতিশীলতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এই আন্দোলন প্রথমে শিক্ষার্থীরা শুরু করলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। তবে আন্দোলনে তরুণ-তরুণীদের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়াও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নেতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যেমন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও আইনি পদক্ষেপ। কিন্তু সরকারের এসব পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা চলমান। বিশেষ করে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে।
এই আলোচনায় আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। আন্দোলনের মূল্যায়নে দ্বৈততা খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এর পক্ষে যেমন কিছু উপাদান রয়েছে, তেমনি বিপক্ষেও আছে। অনেকে এটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে জন আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফল হিসেবে দেখছেন। তবে সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তারা মনে করেন এর মাধ্যমে সহিংসতা বৃদ্ধি ফেযেছে, রাজনৈতিক প্রভাব সক্রিয় ছিল এবং ভবিষ্যতে বিচারহীনতার একটি আশংকা তৈরি হয়েছে।
আরো পড়ুন-
২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা (পর্ব-১)
২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা (২য় পর্ব)
এ পর্যায়ে আন্দোলনের সবলতা ও দূর্বলতার বিষয়ে আলোচনা করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আন্দোলনের সবলতা ছিল ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা, দ্রুত সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কার্যকর ব্যবহার। আর মূল দূর্বলতা ছিল অস্থিরতা ও সহিংসতা, নেতৃত্বের ঘাটতি, তথ্য বিভ্রাট এবং দীর্ঘ মেয়াদী কৌশলের অভাব। বলা যায় এই আন্দোলন পরিচালনায় সংগঠন ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা ছিল প্রকাশিত এবং স্পষ্ট। আন্দোলনে রাজনৈতিক সুযোগ আংশিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। একই সাথে আন্দোলনের দ্রুত বিস্তার ও তথ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি ছিল আরও একটি অন্যতম প্রধান দূর্বলতা।
২০২৪ সালের আন্দোলকে ঘিরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির এর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কিছু কিছু বিশ্লেষকদের মতে, সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো থাকার কারণে তারা আন্দোলনের নির্দিষ্ট পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
কিছু কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের সমর্থকদের সরাসরি উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা এই আন্দোলনকে সাধারণ জনগণের স্বতস্ফুর্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছে।
এ প্রসঙ্গে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন- যাচাইকৃত তথ্য, বহুমুখী উৎস ও পক্ষপাতহীন বিশ্লেষণ। কারণ আন্দোলনের পর পরই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। যা এই আন্দোলনের যথার্থতাকে ম্লান করেছে। আসলে এই আন্দোলন একদিকে গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছে, অন্যদিকে এর সীমাবদ্ধতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তাই বলা যায়, এখানে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় উপাদানের সহাবস্থান ছিল।
তারপরেও ২০২৪ সালের এই গণআন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে এটি নাগরিক অংশগ্রহণকে শক্তিশালী করলেও সহিংসতা, তথ্য বিভ্রান্তি এবং উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক প্রভাব এর কার্যকারিতাকে সীমিত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
দ.ক.সিআর.২৬