
রবিবার ১৩ সেপ্টেম্বর International Remittance Juddah Shonshod-এর উদ্যোগে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে একটি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক Philosopher Deshbandhu Advocate A. N. M. Essa। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের ইউরোপ কমিটির আহ্বায়ক মুসাদ্দিক আহমদ মানিক। সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব এম. এ. রউফ। সভায় প্রধান অতিথি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নকে টেকসই, ভারসাম্যপূর্ণ এবং জনগণকেন্দ্রিক করতে হলে ক্ষমতা, অর্থ, প্রশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে কেন্দ্র থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় পর্যায়ে নিতে হবে। শুধু জেলা বা উপজেলায় সরকারি অফিস স্থাপন করাই বিকেন্দ্রীকরণ নয়; স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, বাজেট, পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে।
সভায় বক্তারা যে বিষয়গুলোর ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন, সেগুলো হলো: স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধান প্রয়োজন। একটি গ্রামের রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল, পানি, বন্যা, ড্রেনেজ বা বাজারের সমস্যা স্থানীয় মানুষ সবচেয়ে ভালো বোঝে। তাই স্থানীয় সরকারকে বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়াতে হবে। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে সমাধানযোগ্য বিষয় যদি মাসের পর মাস কেন্দ্রীয় অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকে, তাহলে সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হয়। উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিলম্বও একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি।
ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন কমাতে হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক সুবিধা যদি শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক থাকে, তাহলে ঢাকার ওপর চাপ বাড়বে এবং অন্য অঞ্চল পিছিয়ে পড়বে।
আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে হবে। উপকূল, হাওর, পাহাড়, শিল্পাঞ্চল, কৃষিপ্রধান অঞ্চল এবং প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকার প্রয়োজন এক নয়। তাই এক নীতিতে পুরো দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে জবাবদিহিতা যুক্ত করতে হবে। স্থানীয় বাজেট প্রকাশ্য করতে হবে, নাগরিক শুনানি চালু করতে হবে, স্বাধীন অডিট রাখতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধির কাজ জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে।
জনগণকে শুধু ভোটার নয়, উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের মতামত বাধ্যতামূলকভাবে নিতে হবে।
নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষ অতিথি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো নাসিমুল গণি, পিএইচডি, এমডব্লিউএস, এমডিএস, এএফডব্লিউসি, পিএসসি (অব.) ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা হয়ে ধাপে ধাপে নেতৃত্ব উঠে এলে সেই নেতৃত্ব জনগণের কাছে বেশি দায়বদ্ধ থাকবে। এটি পিরামিড ডেমোক্রেসির মূল দর্শনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের ছোট সমস্যাগুলো স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সমাধান করলে কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় অর্থনীতি, বৈদেশিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বৃহৎ অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে জরুরি তহবিল ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মূজিবূর রহমান ফ্রান্স বলেন. স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি জেলার নিজস্ব অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে। কোথাও কৃষি, কোথাও পর্যটন, কোথাও শিল্প, কোথাও মৎস্য, কোথাও আইটি কিংবা প্রবাসী বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেশি। স্থানীয় পরিকল্পনা সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে।
প্রবাসী বিনিয়োগ সহজ করতে হবে। প্রতিটি জেলায় কার্যকর NRB Investment Desk চালু করে ভূমি, অনুমোদন, ব্যবসা নিবন্ধন ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবা এক জায়গায় দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে।
সভার বিশেষ অতিথি সবাই বলেন
কোনো প্রকল্প ব্যর্থ হলে কেন্দ্র স্থানীয় সরকারকে এবং স্থানীয় সরকার কেন্দ্রকে দোষ দেবে, এমন ব্যবস্থা চলতে পারে না। ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব এবং দায়িত্বের সঙ্গে জবাবদিহিতা নির্ধারণ করতে হবে।
রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদ পরিবার বলেন মির্জা সূমন । জালাল উদ্দীন
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে ক্ষমতা ভাগ করতে হবে। সব ক্ষমতা এক কেন্দ্রে থাকলে জাতীয় নির্বাচন অনেক সময় সবকিছু দখলের লড়াইয়ে পরিণত হয়। বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতা ভাগ থাকলে রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়।
একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা কমাতে হবে। অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়। স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য তৈরি হয়।
স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত সরকারে পরিণত করতে হবে। শুধু কেন্দ্রের নির্দেশ বাস্তবায়নকারী প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে নয়, স্থানীয় জনগণের নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার হিসেবে তাদের কাজ করতে দিতে হবে।
জনগণের দৈনন্দিন অভিযোগ স্থানীয়ভাবেই সমাধান করতে হবে। রাস্তা, ড্রেন, পানি, বর্জ্য, বাজার, স্কুল, স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ও ভূমি সমস্যা নিয়ে মানুষকে ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রয়োজনভিত্তিক হতে হবে। শুধু প্রকল্প গ্রহণের জন্য প্রকল্প নয়; স্থানীয় জনগণের বাস্তব প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্প নির্ধারণ করতে হবে।
জেলা ও শহরগুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি করা যেতে পারে। কোন শহর পরিষ্কার, কোথায় বিনিয়োগ সহজ, কোথায় শিক্ষা ভালো, কোথায় ডিজিটাল সেবা দ্রুত—এসব সূচকে স্থানীয় সরকারকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব সুস্পষ্ট করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় মানদণ্ড, নিরাপত্তা, বৈদেশিক নীতি ও বড় অবকাঠামো দেখবে; স্থানীয় সরকার নাগরিকের দৈনন্দিন সেবা দ্রুত নিশ্চিত করবে।
বিকেন্দ্রীকরণকে স্লোগান থেকে বাস্তবে নিতে হবে। স্থানীয় সরকারের জন্য নিশ্চিত অর্থায়ন, স্পষ্ট আইনি ক্ষমতা, নির্বাচিত নেতৃত্ব, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি।
সভায় বক্তারা বলেন, ক্ষমতা ভাগ করা মানে দেশ ভাগ করা নয়। বরং ক্ষমতা দায়িত্বশীলভাবে ভাগ করলে রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
একজন বক্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি বড় গাছ একটি ডালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার শক্তি আসে হাজারো শিকড় থেকে। একইভাবে শক্তিশালী ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা এবং স্থানীয় সরকারই একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট এ. এন. এম. ঈসা বলেন, “বাংলাদেশের সমস্যা শুধু সম্পদের অভাব নয়। বড় সমস্যা হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো। সব ক্ষমতা একটি জায়গায় জমা হলে বিলম্ব, তদবির, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক নির্ভরতা বাড়ে। ক্ষমতা জনগণের কাছাকাছি নিলে অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা এবং উন্নয়ন বাড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত।”
পিরামিড ডেমোক্রেসির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “নেতৃত্বের ভিত্তি নিচে থাকতে হবে। স্থানীয় পর্যায় থেকে নেতৃত্ব ধাপে ধাপে ওপরে উঠবে। জনগণ শুধু ভোট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে না; উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট, স্থানীয় সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ থাকতে হবে।”
সভায় আরও বলা হয়, রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ অসম্পূর্ণ এবং আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া উভয় ব্যবস্থাই কার্যকর ফল দেবে না।
প্রধান অতিথি মুসাদ্দিক আহমদ মানিক বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তিনি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং প্রবাসীদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভা পরিচালনাকালে এম. এ. রউফ বলেন, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না; তারা নিজেদের জেলা, উপজেলা ও গ্রামের উন্নয়নেও বিনিয়োগ করতে চান। কিন্তু জটিলতা, বিলম্ব ও কেন্দ্রীয় নির্ভরতার কারণে অনেক সম্ভাবনা নষ্ট হয়। তিনি প্রবাসী বিনিয়োগ সহজ করতে জেলা পর্যায়ে বিশেষ সেবা কাঠামোর প্রস্তাব করেন।
সভায় এই মর্মে মত প্রকাশ করা হয় যে, বাংলাদেশে একটি নতুন জাতীয় বিকেন্দ্রীকরণ কাঠামো নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা শুরু করা দরকার। ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কে কোন দায়িত্ব পালন করবে তা আইনের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে।
সভার সারকথা ছিল:
“ঢাকা সবকিছু করবে না; বাংলাদেশ করবে।”
“জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে।”
“স্থানীয় সরকারকে সত্যিকার অর্থে জনগণের হাতে দিতে হবে।”
“কেন্দ্র শক্তিশালী হবে তখনই, যখন ভিত্তিও শক্তিশালী হবে।”
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক, আন্তর্জাতিক রেমিটেন্স যোদ্ধা সংসদ. লন্ডন/ঢাকা
দ.ক.২৬