
কিছু যুদ্ধ অস্ত্র দিয়ে হয় না। কিছু যুদ্ধের কোনো যুদ্ধক্ষেত্রও থাকে না। সেই যুদ্ধ হয় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের জন্য। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফের পাঁচ বছরের লড়াই তেমনই এক যুদ্ধ—জলের জন্য, মানুষের জন্য, প্রকৃতির জন্য।
তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে এই পথে নামেননি। কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের জন্যও নয়। তাঁর দাবি খুব সাধারণ—খাল তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে পাক, পানি চলাচল করুক, কৃষিজমি বাঁচুক, মাছের অভয়াশ্রম ফিরুক এবং জলাবদ্ধতায় মানুষ যেন আর বছরের পর বছর বন্দি জীবন না কাটায়।
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষক মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ দীর্ঘদিন ধরে মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত দোগনা খাল ও ভূতা খালের অবৈধ ও অপরিকল্পিত বাঁধ অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। তাঁর ভাষায়, এটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়; এটি একটি জনপদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
দোগনা ও ভূতা খাল শুধু দুটি জলপথের নাম নয়। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এসব খালের সম্পর্ক বহু পুরোনো। বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর সংযোগব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এসব জলপ্রবাহ একসময় কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ভারসাম্য রক্ষায় খালগুলোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বাভাবিক জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত ও অবৈধ বাঁধ নির্মাণ, খাল দখল ও সংকোচনের ফলে পানির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও মাছচাষ, কোথাও ব্যক্তিগত স্বার্থ, আবার কোথাও নানা ধরনের স্থাপনা ও মাটি ভরাটের কারণে জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
বর্ষাকালে পানি নামতে না পেরে বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কৃষিজমি পানির নিচে থাকে দীর্ঘ সময়। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে কোথাও দেখা দেয় পানির সংকট। অর্থাৎ পানি যখন প্রয়োজন, তখন পানি নেই; আর যখন পানি বেশি, তখন তা বের হওয়ার পথ নেই।
স্থানীয়দের দাবি, বছরের পর বছর ধরে কয়েক হাজার একর কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে। কৃষকের উৎপাদন কমেছে, মৎস্যজীবীদের জীবিকা সংকুচিত হয়েছে, অনেক পরিবার কর্মসংস্থানের সন্ধানে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়েছে। একসময় যে জলাভূমি ছিল মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল, সেখানে আজ পরিবেশগত ভারসাম্যও প্রশ্নের মুখে। এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা যায় মানুষের মৃত্যুর পরেও। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা কঠিন হয়ে পড়ে—উঁচু করে কবর তৈরি করতে হয়, ইট-বালু দিয়ে কবর রক্ষা করতে হয়। একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ঠিকানাটুকুও যদি পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে তৈরি করতে হয়, তাহলে সেই দুর্ভোগের গভীরতা সহজেই অনুমান করা যায়।
এই বাস্তবতাই রোকনুজ্জামান শরীফকে বারবার প্রশাসনের দরজায় নিয়ে গেছে।
উপজেলা প্রশাসন থেকে জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়—যেখানে মনে হয়েছে মানুষের সমস্যার সমাধান হতে পারে, সেখানেই তিনি যোগাযোগ করেছেন। আবেদন করেছেন, কথা বলেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কখনো আশ্বাস পেয়েছেন, কখনো নিরুৎসাহিত হয়েছেন। কখনো শুনতে হয়েছে কটু কথা। আবার কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যা একজন সাধারণ মানুষকে হয়তো পিছু হটতে বাধ্য করত।
কিন্তু তিনি পিছু হটেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে তাঁকে বিভিন্ন সময় হুমকিও দেওয়া হয়েছে। জীবননাশের আশঙ্কা তৈরি হলেও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি। অবশ্য এসব অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—জনস্বার্থে কথা বলার পথটি তাঁর জন্য সহজ ছিল না।
একজন শিক্ষক তাঁর জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করছেন। নিজের শ্রম, মেধা ও অর্থ ব্যয় করছেন। এর বিনিময়ে ব্যক্তিগতভাবে কী পেয়েছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তাঁর কাছেই নেই। বরং তাঁর প্রত্যাশা, কোনো একদিন এই খালগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে এবং মানুষের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটবে।
এখানেই তাঁর গল্পটি ব্যক্তিগত গল্পের সীমা ছাড়িয়ে যায়। কারণ এটি শুধু রোকনুজ্জামান শরীফের লড়াই নয়। এটি সেই কৃষকের গল্প, যে জমিতে ফসল ফলাতে পারে না। এটি সেই জেলের গল্প, যার জাল আগের মতো মাছ পায় না। এটি সেই পরিবারের গল্প, যারা জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না। এটি সেই শিশুর গল্প, যে বর্ষায় বিদ্যালয়ে যেতে সমস্যায় পড়ে। এটি সেই বৃদ্ধের গল্প, যার চলাচলের পথ পানিতে ডুবে থাকে। সর্বোপরি, এটি একটি জনপদের দীর্ঘদিনের নীরব অপেক্ষার গল্প।
প্রশ্ন হলো—এই সমস্যার সমাধান কি অসম্ভব?
নিশ্চয়ই নয়।
প্রয়োজন হলে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করে খালের প্রকৃত প্রবাহপথ নির্ধারণ করা যেতে পারে। অবৈধ দখল ও বাঁধের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হতে পারে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা যেতে পারে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে বাঁধ অপসারণ, স্লুইসগেট নির্মাণ, ছোট সেতু বা কালভার্ট স্থাপন এবং পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও বৈধ স্বার্থও বিবেচনায় রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি জলব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব। কারও বৈধ জীবিকা বন্ধ করা নয়, আবার কারও ব্যক্তিস্বার্থের জন্য একটি জনপদের স্বাভাবিক জলপ্রবাহও বন্ধ রাখা নয়—এই ভারসাম্যই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিষয়টি যেন কোনো রাজনৈতিক বিবাদে পরিণত না হয়। পানি কোনো দলের নয়, খাল কোনো ব্যক্তির নয়, পরিবেশ কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এগুলো জনগণের সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার।
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফের পাঁচ বছরের লড়াই তাই আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়—একজন মানুষকে কতবার দরজায় কড়া নাড়তে হবে, তার পর রাষ্ট্রের দরজা খুলবে?
আর কত বছর জলাবদ্ধতার সঙ্গে বসবাস করবে মানুষ?
আর কত কৃষিজমি অনাবাদি থাকবে?
আর কত পরিবার জীবিকা হারাবে?
আর কত মৃত মানুষের কবর পানির সঙ্গে যুদ্ধ করবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো ব্যক্তি বিশেষের কাছে নয়; উত্তর দিতে হবে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রকে।
একজন মানুষের একার পক্ষে একটি খাল উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু একজন মানুষের সাহস হাজার মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারে। একটি কণ্ঠস্বর প্রশাসনের নীরবতা ভাঙতে পারে। একটি আন্দোলন ভবিষ্যতের জন্য একটি জনপদকে নতুন জীবন দিতে পারে। রোকনুজ্জামান শরীফের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—অন্যায় বা অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই কারও শত্রু হওয়া নয়। কখনো কখনো প্রতিবাদই ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন ভাষা। তিনি যে পথ বেছে নিয়েছেন, তার শেষ কোথায়—তা আজও নিশ্চিত নয়। বাঁধ কবে অপসারিত হবে, খাল কবে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে পাবে, কৃষিজমি কবে আবার সবুজ হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎই দেবে। তবে পাঁচ বছর ধরে একজন মানুষ যে প্রশ্নটি বারবার তুলছেন, সেটি উপেক্ষা করার মতো নয়।
জলকে তার পথ ফিরিয়ে দিন।
মানুষকে তার জীবন ফিরিয়ে দিন।
প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে দিন। কারণ একটি খাল বাঁচানো মানে শুধু পানি চলাচলের পথ খুলে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি, মানুষের স্বপ্ন এবং একটি জনপদের ভবিষ্যৎ।
দক্ষিণ বাংলার এই নীরব কান্না যদি সত্যিই আমাদের কানে পৌঁছে থাকে, তবে এখন প্রয়োজন আরেকটি আবেদন নয়—প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং বাস্তবসম্মত কার্যকর পদক্ষেপ।
মানুষ অপেক্ষা করছে।
জল অপেক্ষা করছে।
খাল অপেক্ষা করছে।
আর অপেক্ষা করছে একটি জনপদ—তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য।
দ.ক/আ.ঠ