
নিজস্ব প্রতিবেদক: হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অফিসে নিয়মিত উপস্থিত না থাকা, সরকারি দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, বিদ্যালয় পরিদর্শনে অনিয়ম, বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর ও সুপারিশের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ এবং সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দের অর্থ থেকে শতাংশ হারে টাকা দাবির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের তীর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী এবং সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোশাহিদ মিয়ার দিকে। শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে অনিয়মের কারণে বাহুবল উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের অস্বচ্ছ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, দুই কর্মকর্তা নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকেন না। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে অফিসে অনুপস্থিত থেকে বাসায় বসেই কিছু শিক্ষকের মাধ্যমে দাপ্তরিক ফাইলপত্রের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষা অফিসে প্রয়োজনীয় কাজে গিয়ে অনেক সময় কর্মকর্তাদের পাওয়া যায় না। তাদের কেউ কেউ নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সময় দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের অভিযোগ, ক্ষুদ্র মেরামত, রুটিন মেইনটেন্যান্সসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের ফাইল অনুমোদন ও স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অর্থ দাবি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দাপ্তরিক নথিতে স্বাক্ষর করাতেও অর্থ দিতে হয়। হাতে নগদ টাকা না থাকলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কথাও কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন।
এছাড়া চিকিৎসাজনিত ছুটির সুপারিশের জন্য ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা, মাতৃত্বকালীন ছুটির সুপারিশের জন্য ২ থেকে ৩ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
শিক্ষকদের অভিযোগ, দুই কর্মকর্তা নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন না। আবার পরিদর্শনে গেলে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলীর নামে দাখিল করা কয়েকটি টিএ (ভ্রমণ ভাতা) বিল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে না গিয়েও নাম-বেনামে টিএ বিল দাখিল করেছেন। এ ধরনের একাধিক টিএ বিল, যার পরিমাণ লক্ষাধিক টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে, উপজেলা হিসাবরক্ষণ/এজি অফিসে জমা রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীরা আরও জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন বিদ্যালয়ে এডহক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার সময় সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে মো. মোশাহিদ মিয়া সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব থেকে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সভাপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন হওয়ায় প্রতিটি চেকে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া প্রাক-প্রাথমিক, রুটিন মেইনটেন্যান্স, ওয়াশব্লক মেইনটেন্যান্সসহ বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাহুবল উপজেলার নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য প্রতিটি দেড় লাখ টাকা করে বরাদ্দ পেয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোশাহিদ মিয়ার দায়িত্বাধীন ক্লাস্টারের বরাদ্দ পাওয়া বিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকেও প্রায় ২০ শতাংশ হারে অর্থ নেওয়া হয়েছে। এতে কেউ আপত্তি করলে তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলেও কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন বা এসিআর সংক্রান্ত কাজেও অর্থ নেওয়ার দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এসিআরের প্রতিটি পাতার জন্য ১০০ টাকা করে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৬ সালে ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য বরাদ্দ পাওয়া উপজেলার ৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি থেকে ১০ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
‘নৈশ প্রহরী নবায়ন’ কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ১০৩টি বিদ্যালয়ের প্রতিটির কাছ থেকেও ১০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক। শিক্ষক মোটিভেশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষকদের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বই বিক্রির অর্থ, ইন্টারনেট বিল, ভবন নির্মাণ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং শিক্ষকদের যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন খাতেও অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, সরকারি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে ভুয়া কাগজপত্র, বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা হতে পারে। কিছু বিদ্যালয়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি, শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, অনেক শিক্ষক ক্লাস চলাকালীন বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকে উপজেলা সদরে এসে বিভিন্ন অফিসে ঘোরাঘুরি ও দালালির সঙ্গে জড়িত থাকেন। বিষয়টি শিক্ষা কর্মকর্তাদের নজরে থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোশাহিদ মিয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষা অফিসকে কেন্দ্র করে ‘দালালি’ পরিচালনার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
পূর্ব জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলাকালে একজন শিক্ষিকা তদন্ত কর্মকর্তার প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত কার্যক্রমেও দায়সারা মনোভাবের পরিচয় দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন, বিদ্যালয়ের উপস্থিতি রেজিস্টার, পরিদর্শন প্রতিবেদন, বিল-ভাউচার ও অন্যান্য সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষক ও অভিযোগকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়ম আরও বাড়ছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের পাশাপাশি উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
তাদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের হিসাব, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চেক, বিল-ভাউচার, টিএ বিল, বিদ্যালয় পরিদর্শন রেজিস্টার, ছুটির সুপারিশ এবং বরাদ্দের অর্থের ব্যবহার সরেজমিনে যাচাই করা হোক।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোশাহিদ মিয়ার বক্তব্য নেওয়া জন্য মুঠোফোনে কয়েক বার ফোন দিয়েও রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
দ.ক/এনআইআর