
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা গ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে অবশেষে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে থাকা একটি বাঁধ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালে কেটে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলার বাদুরা মহিলা মাদ্রাসা সংলগ্ন ওই বাঁধটি অপসারণের পর দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ এলাকায় জমে থাকা পানি দ্রুত সরে যেতে শুরু করেছে। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা গ্রামের দোগনা ও ভূতা খালে দেওয়া বাঁধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর সংযোগস্থলের এসব খালের পানি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ার পাশাপাশি বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলাবদ্ধতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপরও।
জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসন ও অবৈধ বাঁধ অপসারণের দাবিতে স্থানীয় মানুষ প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এ বিষয়ে মঠবাড়িয়া সাংবাদিক সমাজ ও মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাবের উদ্যোগে প্রতিবাদ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। উপজেলা প্রশাসন, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি প্রচারিত হয়। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখনীর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগটি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। তবে এই দীর্ঘ আন্দোলনের পথ ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। প্রভাবশালী মহলের চাপ ও বিভিন্ন বাধার কারণে কাঙ্ক্ষিত সমাধান পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। জনস্বার্থে বিষয়টি তুলে ধরার কারণে সাংবাদিক ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরুৎসাহিত করা, কটু কথা বলা এবং একাধিকবার জীবননাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তারপরও জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবি থেকে তাঁরা সরে আসেননি।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরা বলেন, এ লড়াই কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা প্রাপ্তির জন্য নয়। এটি ছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং কৃষক, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি।
বাঁধ অপসারণের পর স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। তাঁরা আশা করছেন, অবশিষ্ট সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে আবার কোনো অবৈধ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।
জনস্বার্থের এ উদ্যোগে সহযোগিতার জন্য পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ রুহুল আমিন দুলাল, জেলা প্রশাসক মোঃ আবু সাঈদ, মঠবাড়িয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্য কে. এম. হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরা।
দীর্ঘ পাঁচ বছরের এই ঘটনাপ্রবাহ আবারও প্রমাণ করল—জনগণের ন্যায্য দাবি সত্য, ধৈর্য ও ঐক্যের সঙ্গে তুলে ধরা হলে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা সম্ভব। একটি কলম হয়তো একদিনে কোনো বাঁধ কাটতে পারে না; কিন্তু সেই কলম মানুষের কণ্ঠকে শক্তিশালী করে, প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং জনস্বার্থের পক্ষে পরিবর্তনের ভিত তৈরি করতে পারে।
এ প্রসংগে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাদুরার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসানের পথে বাঁধ অপসারণ তাই শুধু একটি অবকাঠামো সরিয়ে ফেলার ঘটনা নয়; এটি জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি দৃশ্যমান বিজয়।
দ.ক.২৬