
বাংলাদেশ আজ একটি তরুণপ্রধান দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশই তরুণ ও যুবক শ্রেণী। অর্থাৎ, এই শ্রেণীই জাতির শক্তি, আগামীর চালিকাশক্তি। উন্নয়ন, উদ্ভাবন, অর্থনীতি কিংবা নেতৃত্ব—সবক্ষেত্রেই তরুণ সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ এই তরুণ সমাজ এক গভীর সঙ্কটে পতিত হয়েছে। তাদের একাংশ দিশাহারা, হতাশ; অন্য অংশ রাজনীতির নেশায়, অস্থিরতায় বা উদ্দেশ্যহীন জীবনে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের তরুণ সমাজের এই ধ্বংসের দায় আসলে কার?
শিক্ষার দুরবস্থা ও দিকনির্দেশনার অভাব: দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজও জ্ঞান নয়, বরং পরীক্ষানির্ভর। বইপড়ার অভ্যাস, গবেষণা, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা—সবই হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিযোগিতার চাপে। এসএসসি বা এইচএসসি পেরোনোর পর একজন তরুণকে প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হলেও, তখন তার চিন্তাশক্তি বা নৈতিক পরিপক্বতা কতটা গঠিত হয়—এই প্রশ্নটি আমরা উপেক্ষা করে যাচ্ছি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজ চাকরি নির্ভর সনদ তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। সেখানে জীবনবোধ, নাগরিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা অনুপস্থিত। ফলে তরুণরা বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপ্রস্তুত থেকে যায়।
রাজনীতির টান ও তরুণদের বিপর্যয়:
বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে রাজনীতি আজ প্রচণ্ডভাবে টানছে। একসময় ছাত্ররাজনীতি ছিল নেতৃত্ব গড়ে তোলার এক মহৎ বিদ্যালয়; কিন্তু আজ তা অনেক ক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে ক্ষমতার লড়াইয়ের অঙ্গনে।
অনেক তরুণ এসএসসি বা এইচএসসি শেষ করার পরই রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে জড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তারা পড়াশোনার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করছে দলীয় কার্যক্রমে—পোস্টার টানায়, মিছিলে, সভা-সমাবেশে। নেতাদের সুবিধার জন্য রাতের পর রাত ব্যস্ত থাকতে হয়, তাদের নির্দেশে চলতে হয়। ধীরে ধীরে সেই তরুণ বুঝতেই পারে না, তার নিজের ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাচ্ছে।
যুবক যখন রাজনীতির জালে বন্দী:
যুবক বয়স এমন এক সময়, যখন আবেগ ও স্বপ্ন একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। কিন্তু যখন এই শক্তিকে কেউ দখলে নেয়, তখন সেটি হয়ে ওঠে ধ্বংসের আগুন। বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো—রাজনীতির জালে বন্দী হচ্ছে হাজারো তরুণ। তারা ভাবে, নেতার পাশে থাকলে সুযোগ আসবে; কিন্তু বাস্তবে তারা পরিণত হচ্ছে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রে।
অনেক তরুণ দিনে পরিবারের সন্তান, আর রাতে দলের কর্মী। নেতার ডাকে ঘর ছাড়ে, ঝুঁকি নেয়, সহিংসতার পথে যায়। তাদের এই ভুল পথে যাওয়া এক সময় পরিবারকেও ধ্বংস করে দেয়। বাবা-মায়ের কষ্ট, সমাজের চাপ, আর নিজের ভবিষ্যতের অন্ধকার—সবকিছু মিলে এক ভয়াবহ চক্র তৈরি হয়। কিন্তু এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ বা সহায়তা তারা কোথাও পায় না।
প্রলোভনের রাজনীতি ও নৈতিক পতন:
আজকের রাজনীতিতে তরুণরা নেতৃত্বের বিদ্যালয়ে নয়, বরং “প্রভাবের চর্চায়” শিক্ষিত হচ্ছে। সহজ–সরল তরুণরা অল্প কিছু আর্থিক প্রলোভন বা পদ-পদবির আশায় নেতাদের অনুসারী হয়ে যায়। তাদের আবেগিক শক্তি ব্যবহার করা হয় দলীয় বল প্রদর্শনে, কখনো সহিংসতায়, কখনো অপসংস্কৃতির প্রচারে।
এই প্রজন্ম বুঝতে পারে না, যাদের পক্ষে তারা লড়ছে, তারা কখনোই তাদের জীবন বা ভবিষ্যতের দায় নেয় না। “নিজের বাপের খেয়ে, পরের বনের মহিষ তাড়া”—এই প্রবচন যেন আজকের বাস্তব চিত্র।
সামাজিক মূল্যবোধের পতন ও প্রযুক্তিনির্ভর ভ্রান্তি: ডিজিটাল যুগ তরুণদের সামনে বিশ্বকে উন্মুক্ত করেছে, কিন্তু সঙ্গে এনেছে ভোগবাদ, মিথ্যা গ্ল্যামার ও অবাস্তব আকাঙ্ক্ষার প্রতিযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ অনেকের কাছে বাস্তব জীবনের বিকল্প।
ফলাফল—তরুণরা হারাচ্ছে ধৈর্য, সহনশীলতা ও বাস্তবতার অনুভব। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কমছে, বাড়ছে একাকিত্ব ও হতাশা। এই শূন্যতা অনেককে ঠেলে দিচ্ছে মাদক, অপরাধ বা সহিংস রাজনীতির দিকে।
রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের দায়:
তরুণদের এই সঙ্কট কেবল তাদের নিজের তৈরি নয়। রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সবাই সমানভাবে দায়ী।
রাষ্ট্র তরুণদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থান, মানসিক বিকাশ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জ্ঞান ও মানবিকতার চর্চা থেকে সরে গিয়ে কেবল ফলাফল ও সার্টিফিকেট নির্ভর হয়ে পড়েছে। পরিবারও ব্যস্ততার চাপে সন্তানকে সময় দিতে পারছে না। আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব তরুণদের শক্তি ব্যবহার করছে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কোনো বিনিয়োগ করছে না।
করণীয়:
১.শিক্ষা সংস্কার: পরীক্ষানির্ভরতা থেকে বের হয়ে সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও নাগরিক চেতনা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
২.অরাজনৈতিক যুব উন্নয়ন কর্মসূচি: উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা ও ক্রীড়া–সংস্কৃতির সুযোগ বাড়াতে হবে।
৩.ছাত্ররাজনীতির পুনর্গঠন: সহিংসতা, দখল বা প্রভাবের রাজনীতি নয়—বরং আদর্শনির্ভর নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্র করতে হবে।
৪.পারিবারিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা: সন্তানকে শুধু সফল নয়, সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মনোভাব ফিরিয়ে আনতে হবে।
৫.রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বশীলতা: তরুণদের প্রলোভনে না ফেলে, তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে সহায়তা দিতে হবে।
তরুণরাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের আবেগ, উদ্যম ও সৃজনশীলতাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু যদি সেই শক্তি ভুল পথে পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিই একদিন ধ্বংসের কারণ হবে। আজ সময় এসেছে—রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজ একসঙ্গে ভাবুক, তরুণদের কীভাবে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া যায়।
তরুণদের যদি সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও সুযোগ দেওয়া যায়, তবে তারা শুধু নিজেদের নয়—পুরো জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারবে। কিন্তু যদি আমরা তাদের আজও ব্যবহার করতে থাকি, তাদের আবেগকে শোষণ করি, তাহলে একদিন বুঝব—নেতা জিতেছে, কিন্তু জাতি হেরে গেছে।
লেখক: কবি কলামিস্ট ও সাংবাদিক
দ.ক.২৬