1. live@kaalnetro.com : Bertemu : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন

পানির পথ রুদ্ধ, খাল দখল ও অবৈধ বাঁধে পরিবেশ ও জীবিকার গভীর সংকট

দৈনিক কালনেত্র
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬

 

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ: বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল প্রকৃতিগতভাবে নদী, খাল ও জলাভূমিনির্ভর একটি অঞ্চল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জোয়ার-ভাটার পানিই এখানে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনধারার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ক্রমশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রভাবশালী মহলের বাঁধ নির্মাণ, খাল দখল এবং পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের বহু এলাকায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পানি সংকট, যা এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের রূপ নিচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক খাল ও নদীর মুখে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দেওয়া হয়েছে কিংবা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবেশ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আগে যেখানে জোয়ারের পানি সহজেই বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করত, এখন সেখানে পানির প্রবাহ থমকে গেছে। অনেক গ্রাম ও কৃষিজমি পানির অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও পানি আটকে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

খালগুলো একসময় ছিল গ্রামের প্রাণরেখা। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি খাল বেয়ে মাঠে প্রবেশ করত, পুকুর ও জলাধার ভরে উঠত, মাটির উর্বরতা বাড়ত। কিন্তু বর্তমানে বহু খাল ভরাট হয়ে গেছে বা সংকুচিত হয়েছে। কোথাও ময়লা-আবর্জনা ফেলে খাল নষ্ট করা হয়েছে, আবার কোথাও ব্যক্তিস্বার্থে বাঁধ নির্মাণ করে পানির পথ বন্ধ করা হয়েছে। ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক জলচক্র ব্যাহত হয়ে পড়েছে।

পানির এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। দক্ষিণাঞ্চলের বহু পরিবার এখন গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় পানির জন্য সংগ্রাম করছে। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, এমনকি গবাদিপশুর পানির ব্যবস্থাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারীদের কষ্ট বেড়েছে বহুগুণ। অনেক ক্ষেত্রে দূরবর্তী এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা সময় ও শ্রম উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কৃষিখাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। খাল ও নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখা যাচ্ছে না। ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, আগে প্রাকৃতিকভাবে জমি সেচ পেত, এখন সেই সুযোগ না থাকায় অতিরিক্ত খরচ করে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে, যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়।

ফলজ বৃক্ষের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে নারকেল গাছ, যা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অংশ, তার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পানির অভাবে গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফল ঝরে যাচ্ছে কিংবা গাছ দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় দীর্ঘদিনের বাগান আজ প্রাণহীন হয়ে পড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
মৎস্যসম্পদও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদী ও খালের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ছোট মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় জেলেরা আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। ফলে তাদের জীবিকা সংকটের মুখে পড়েছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে একটি অঞ্চলের সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানির সঙ্গে মাটির লবণাক্ততা, পুষ্টি উপাদান এবং জীববৈচিত্র্যের একটি ভারসাম্য জড়িয়ে থাকে। যখন সেই প্রবাহ থেমে যায়, তখন মাটির উর্বরতা কমে, গাছপালা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগোয়।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, কয়েক দশক আগেও নদী-খালের পানি ছিল জীবন ও আশীর্বাদের প্রতীক। বর্ষার পানি জমিকে উর্বর করত, মাছের প্রাচুর্য বাড়াত এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করত। এখন সেই পানি না থাকায় প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে কাঁদছে। মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে, খাল হারাচ্ছে অস্তিত্ব, আর মানুষের জীবনে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা এবং দখলদারিত্ব। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সুবিধা নেওয়ার জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করা হয়নি। ফলে একটি এলাকার সাময়িক লাভ অন্য এলাকায় বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ। নদী ও খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত পুনঃখনন এবং পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ পুনরুদ্ধার অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি বাঁধ নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পানি ব্যবস্থাপনায় জনগণের সচেতনতা বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জলব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করে নদী-খালকে জীবন্ত রাখতে হবে।

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এখনো আশায় বুক বাঁধে। তারা বিশ্বাস করেন, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে আবার সবুজে ভরে উঠবে মাঠ, প্রাণ ফিরে পাবে গাছপালা, আর স্বস্তি ফিরে আসবে মানুষের জীবনে। প্রকৃতি কখনো প্রতিশোধ নেয় না, কিন্তু অবহেলার মূল্য মানুষকেই দিতে হয়—এই উপলব্ধিই এখন সবচেয়ে জরুরি।
নদী বাঁচানো মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; এটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। তাই দক্ষিণাঞ্চলের পানির পথ খুলে দেওয়া আজ সময়ের দাবি, মানুষের দাবি এবং প্রকৃতির নীরব আহ্বান।

দ.ক.সিআর.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট