
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিমধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসে, ততই বাড়তে থাকে মানুষের দরজায় দরজায় সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিদের আনাগোনা। অসুস্থ রোগী দেখতে যাওয়া, দরিদ্র মানুষের হাতে সাহায্য তুলে দেওয়া, দুরারোগ্য রোগীর চিকিৎসায় সহযোগিতার আশ্বাস, জলাশয় ও রাস্তাঘাট পরিষ্কারের উদ্যোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, জানাজায় অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে মনে হয়, মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মানুষের যেন অভাব নেই!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দরদ ও ভালোবাসা কি সারা বছরের, নাকি কেবল নির্বাচনের মৌসুমি আয়োজন?
নির্বাচনের আগে যিনি মানুষের বাড়িতে গিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করেন, নির্বাচনের পরে তিনিই কি সেই মানুষের বিপদে পাশে থাকেন? যিনি ভোটের আগে অসহায় মানুষের হাত ধরে সহযোগিতার আশ্বাস দেন, নির্বাচনের পর তাঁর দরজায় গিয়ে কি আর তাঁকে পাওয়া যায়? যিনি আজ মানুষের দুঃখে ব্যথিত হয়ে চোখের পানি ফেলছেন, কাল জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও কি সেই মানবিকতা ধরে রাখবেন?
এ প্রশ্নগুলো ভোটারদের ভাবতে হবে।
আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ আছেন, যাঁরা সারা বছর এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের খোঁজ রাখেন না। কেউ প্রবাসে, কেউ দেশের বড় পদে চাকরিরত, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন পর এলাকায় ফিরে হঠাৎ জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অবশ্য প্রবাসী কিংবা উচ্চপদে কর্মরত কেউ নির্বাচনে অংশ নেবেন না, এমন কথা নয়। প্রত্যেক নাগরিকেরই যোগ্যতা ও আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যিনি দীর্ঘদিন মানুষের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক রাখেননি, বিপদে পাশে দাঁড়াননি, এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হননি, তিনি হঠাৎ কীভাবে মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধি হয়ে উঠবেন?
অর্থসম্পদ জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। অর্থ উপার্জন আর মানুষের কল্যাণে কাজ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কেউ বিপুল অর্থের মালিক হলেই তিনি সমাজসেবক হয়ে যান না। অর্থের উৎস, উপার্জনের সততা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পদ-পদবি, শিক্ষাগত ডিগ্রি কিংবা নামের আগে-পরে নানা উপাধি থাকলেই একজন মানুষ যোগ্য নেতৃত্বের অধিকারী হন না। প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁর কর্মে, সততায় ও আচরণে।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণ। ভোটাররা কারও দয়া বা অনুগ্রহের পাত্র নন; বরং জনপ্রতিনিধি জনগণের সেবক। অথচ নির্বাচনের সময় সামান্য আর্থিক সহায়তা, উপহার কিংবা মিষ্টি কথায় অনেক সময় ভোটারের বিবেচনাবোধ প্রভাবিত হয়। সাময়িক আবেগে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে পরবর্তী পাঁচ বছর এলাকার মানুষকে তার মূল্য দিতে হতে পারে। তাই ভোট দেওয়ার আগে প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড, সততা, যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যাচাই করা জরুরি।
একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় সম্পদ হওয়া উচিত তাঁর সুন্দর ব্যবহার। হাসিমুখে কথা বলা, ছোট-বড় সবাইকে সম্মান করা, মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো—এসবই নেতৃত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য। ভদ্রতা ও বিনয় কোনো পদবি দিয়ে কেনা যায় না। এর শিকড় থাকে পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত চরিত্রে। একজন মানুষের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁর পরিবার, আর বাবা-মা তাঁর প্রথম শিক্ষক। রাজনীতিতে কর্মীদের অবদানও অনস্বীকার্য। অথচ দুঃখজনকভাবে কখনো কখনো দেখা যায়, নির্বাচনের সময় কর্মীদের ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তাঁদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ পাওয়া যায় না। প্রকৃত নেতা তিনি নন, যিনি শুধু সুসময়ে মানুষের ভালোবাসা গ্রহণ করেন; প্রকৃত নেতা তিনি, যিনি দুর্দিনেও মানুষের হাত ছেড়ে দেন না।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জনপ্রিয়তার অন্যতম ভিত্তি ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড। ইতিহাস আমাদের শেখায়, মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন তৈরি করতে অর্থের জৌলুশ নয়, প্রয়োজন সততা, সাহস, প্রজ্ঞা ও জনসেবা।
আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি নির্বাচনের আগে যেমন মানুষের দরজায় যাবেন, নির্বাচনের পরেও তেমনি মানুষের পাশে থাকবেন। যিনি প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন। যিনি প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করবেন না, কর্মীকে ব্যবহার করবেন না এবং জনগণকে ক্ষমতার অধীনস্থ ভাববেন না।
মনে রাখতে হবে, নির্বাচন পাঁচ বছরের জন্য জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া; কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে হয় প্রতিদিনের আচরণ ও কর্মের মাধ্যমে। পদ একদিন থাকবে না, ক্ষমতা একদিন শেষ হবে, নির্বাচনী পোস্টারও একসময় দেয়াল থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি, একটি আন্তরিক হাসি এবং সম্মানজনক আচরণ মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
তাই আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হোক যোগ্যতা, সততা, শালীনতা ও মানবিকতার প্রতিযোগিতা। ভোটাররা আবেগে নয়, বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। প্রার্থীর সম্পদ, প্রভাব কিংবা প্রচারণার জৌলুশ নয়, তাঁর অতীত, বর্তমান, চরিত্র ও জনসেবার মানসিকতা বিবেচনা করুন।
আমরা ভোটের মৌসুমি দরদি চাই না; আমরা চাই মানুষের প্রকৃত আপনজন। আমরা ক্ষমতার মালিক নয়, জনগণের সেবক—এমন জনপ্রতিনিধি চাই। কারণ একজন ভালো জনপ্রতিনিধি শুধু একটি ইউনিয়নের উন্নয়ন করেন না, তিনি মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণেও ভূমিকা রাখেন।
কালনের