
জমি-জমার বিরোধ ও ব্যক্তিগত শত্রুতাকে রাজনৈতিক মামলায় রূপ দেওয়ার অভিযোগ; ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামলে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অধিকাংশ গায়েবি মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করত বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব মামলার তালিকা তৈরি হতো নুরুল ইসলাম মনির অফিসে বসে। সেই তালিকা অনুযায়ী থানায় মামলা রেকর্ড হতো।
*কারা ছিলেন এই সিন্ডিকেটে? অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে*
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে যে নামগুলো উঠে এসেছে:
১. *নুরুল ইসলাম মনি* – অভিযোগ রয়েছে, তার অফিসই ছিল মামলার তালিকা তৈরির মূল কেন্দ্র।
২. *নুরুল ইসলাম নুর* – মডেল প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাংবাদিকতার আড়ালে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মামলার তালিকায় নাম ঢোকাতেন।
৩. *মনিরুল ইসলাম শামীম* – তালিকা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন বলে অভিযোগ।
৪. *অলিউর রহমান অলি* – যুবলীগের সাবেক সভাপতি। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মামলা দিতেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
৫. *আব্দুল হাই* – সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে তালিকা চূড়ান্ত করতেন বলে অভিযোগ।
*যেভাবে মামলা দেওয়া হতো: ভুক্তভোগীদের বয়ান*
বাহুবল উপজেলা বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আমার বাড়িতে পুলিশ আসে। বলে, নাশকতার মামলায় আমি আসামি। অথচ ওই তারিখে আমি সিলেটে চিকিৎসাধীন ছিলাম। পরে জানলাম, নুরুল ইসলাম মনির অফিস থেকে আমার তালিকা দেওয়া হয়েছে।
বাহুবলের এক ছাত্র নেতা বলেন, “অলিউর রহমান অলির সাথে আমার পূর্ব থেকে বিরোধ ছিল। আমারে শিক্ষা দিতে নাশকতার মামলায় নাম দিছে। ৩ মাস জেল খাটছি। আমার পোলাডার পড়ালেখা বন্ধ হয়া গেছে।”
আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “আব্দুল হাই চেয়ারম্যানের লোক আমার জমি দখল করতে চাইছিল। রাজি না হওয়ায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা খাইছি। বলা হইছে, আমি নাকি বোমা বানাই। অথচ জীবনে পটকাও ফুটাই নাই।”
*অভিযোগের ধরন ৩টি*
১. *ব্যক্তিগত শত্রুতা:* জমি-জমা, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসানো।
২. *রাজনৈতিক দমন:* বিএনপি-জামায়াতের সক্রিয় কর্মীদের তালিকা করে ‘নাশকতার পরিকল্পনা’, ‘ককটেল বিস্ফোরণ’ এর গায়েবি মামলা দেওয়া।
৩. *সন্ত্রাস বিরোধী আইনের অপব্যবহার:* সাধারণ মানুষকে ‘জঙ্গি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দিয়ে মাসের পর মাস জেলে রাখা।
*থানা পুলিশ কী বলছে?*
বাহুবল মডেল থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগে উপর থেকে যেভাবে নির্দেশনা আসত, সেভাবে কাজ করতে হতো। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা যাদের নাম দিত, যাচাই-বাছাই ছাড়াই মামলা নিতে হতো। এখন দিন বদলাইছে। আমরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি।”
*জনমনে প্রশ্ন: ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?*
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অভিযুক্ত ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে বাহুবলজুড়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
বাহুবল নাগরিক অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক বলেন, “যারা দিনের পর দিন রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে, তাদের বিচার না হলে ‘নতুন বাংলাদেশ’ কথাটা অর্থহীন। আমরা ৩ দফা দাবি জানাচ্ছি:
১. স্বৈরশাসনামলে বাহুবলে দায়ের হওয়া সব রাজনৈতিক মামলার তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
২. বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করে গায়েবি মামলার হোতাদের চিহ্নিত করতে হবে।
৩. নুরুল ইসলাম মনি, নুরুল ইসলাম নুর, মনিরুল ইসলাম শামীম, অলিউর রহমান অলি ও আব্দুল হাই গংদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করতে হবে।
*শেষ কথা*
একটি স্বাধীন দেশে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের জন্য মামলাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। বাহুবলের মানুষ এখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। প্রশাসনের উচিত, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে অতীতের গায়েবি মামলার নেপথ্যের কুশীলবদের আইনের আওতায় আনা। তা না হলে মামলা-বাণিজ্যের এই সংস্কৃতি বন্ধ হবে না।
দ.ক.সিআর.২৬