1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
গুরু ও পিতা-মাতা; যাদের ঋণ শোধ হয় না দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় এসআরবি-৯-এর বিশেষ নজরদারি, মাঠে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল মিরপুরে তীব্র যানজট, নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় জনদুর্ভোগ চুনারুঘাটে চেয়ারম্যান প্রার্থী মারুফের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা নিয়ে পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন ইউএনও-র সাথে চুনারুঘাট মডেল প্রেসক্লাবের মতবিনিময়  চুনারুঘাট সরকারি কলেজের সামনে অবৈধ বাণিজ্য মেলা: ৫ জনের কারাদণ্ড চুনারুঘাটে চা-বাগান এলাকায় তিন বন্ধুর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: প্রাণ গেল একজনের, আশঙ্কাজনক ২ স্বাধীন সাংবাদিকতা, তথ্য ও মতপ্রকাশের সুরক্ষায় ১২ দফা সুপারিশ ক্যান্সার আক্রান্ত পারভীন আক্তার কে আর্থিক সহযোগিতা করলেন মানবিক বিল্লাল মিয়া চুনারুঘাটের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ ছয়শ্রীর দূর্গোৎসব

গুরু ও পিতা-মাতা; যাদের ঋণ শোধ হয় না

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

মানবজীবন কেবল জন্মগ্রহণ, বড় হওয়া কিংবা জীবিকা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি জীবন তখনই সার্থক হয়ে ওঠে, যখন মানুষ জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়, বিবেকের আলোয় সত্যকে চিনতে শেখে এবং নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করে অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে। আর এই মহৎ জীবন গঠনের পেছনে যাঁদের অবদান সবচেয়ে গভীর, তাঁরা হলেন পিতা-মাতা ও গুরু। পিতা-মাতা আমাদের পৃথিবীতে আসার পথ তৈরি করেন, আর শিক্ষক বা গুরু আমাদের সেই পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে বাঁচার শিক্ষা দেন। তাঁদের স্নেহ, ত্যাগ, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা মানুষের জীবনকে আলোকিত করে।

পিতা-মাতা: জীবনের প্রথম শিক্ষক

একটি শিশুর জীবনে শিক্ষার সূচনা হয় পরিবার থেকে। জন্মের পর পিতা-মাতার স্নেহ, যত্ন ও ভালোবাসার মধ্য দিয়েই সে পৃথিবীকে চিনতে শেখে। মা-বাবার মুখের ভাষা, আচরণ, দায়িত্ববোধ, সততা ও পারস্পরিক সম্পর্ক শিশুর কোমল মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁরা সন্তানের প্রথম আশ্রয়, প্রথম নির্ভরতা এবং জীবনের প্রথম শিক্ষক।
সন্তানকে বড় করে তুলতে পিতা-মাতাকে কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তার সবটুকু সন্তান অনেক সময় বুঝতেও পারে না। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে তাঁরা সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। সন্তানের অসুস্থতায় তাঁদের চোখে ঘুম থাকে না, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের চিন্তার শেষ থাকে না। সন্তানের সাফল্যে তাঁরা আনন্দিত হন, আবার তার ব্যর্থতায় নীরবে কষ্ট পান। তবে সন্তানকে শুধু বড় করাই পিতা-মাতার দায়িত্ব নয়; তাকে একজন সৎ, বিবেকবান, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অর্থ-সম্পদ কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা মানুষকে পরিচিতি দিতে পারে, কিন্তু সুন্দর চরিত্রই তাকে প্রকৃত মর্যাদা এনে দেয়।

গুরু: অজ্ঞতার অন্ধকারে জ্ঞানের প্রদীপ

পিতা-মাতার হাত ধরে শিশুর জীবন শুরু হলেও জ্ঞান, যুক্তি ও বিবেকের বিস্তৃত জগতে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক হলেন শিক্ষক বা গুরু। তিনি শুধু বইয়ের পাঠ শেখান না; শেখান কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে হয় এবং কীভাবে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হয়।

একজন প্রকৃত শিক্ষক শিক্ষার্থীর সামনে জ্ঞানের দরজা খুলে দেন। তাঁর শিক্ষা শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে, ভুল থেকে শিখতে এবং যুক্তির আলোয় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। যে শিক্ষার্থী একসময় নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে অনিশ্চিত থাকে, একজন উৎসাহদায়ী শিক্ষক তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারেন। তাঁর একটি আন্তরিক কথা, একটি সঠিক পরামর্শ কিংবা সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা বদলে দিতে পারে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের গতিপথ।

গুরু যেন উত্তাল নদীতে পথ দেখানো কাণ্ডারি। জীবনের ঝড়, হতাশা ও ব্যর্থতার মুহূর্তে তাঁর শিক্ষা মানুষকে স্থির থাকতে সাহায্য করে। তবে শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য কেবল তাঁর শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফলে নয়; বরং শিক্ষার্থী কতটা মানবিক, বিবেকবান ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠল, তার মধ্যেও সেই সাফল্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা: বিনয়ের সৌন্দর্য

গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের সবচেয়ে সুন্দর উপায় শুধু তাঁর সামনে মাথা নত করা নয়; বরং তাঁর দেওয়া ভালো শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করা। শ্রদ্ধা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা আচরণে, কর্মে ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়। একজন শিক্ষার্থীর সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং অন্যের প্রতি সম্মানই তার শিক্ষার প্রকৃত পরিচয় বহন করে।
যে মানুষ জ্ঞান অর্জন করেও বিনয়ী থাকতে পারে, সে-ই প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত। অন্যদিকে, বিদ্যা ও সাফল্যের অহংকার মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলিয়ে দিতে পারে। তখন সে অন্যের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে অবজ্ঞা করে, ভুল স্বীকার করতে চায় না এবং নিজের অগ্রগতির পথ নিজেই সংকুচিত করে ফেলে।

জীবনে সাফল্য অর্জন করলে নিজের প্রচেষ্টার পাশাপাশি যাঁরা পথ দেখিয়েছেন, তাঁদের অবদানও স্মরণ করা উচিত। কারণ, মানুষের অর্জনের পেছনে ব্যক্তিগত পরিশ্রমের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষক, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সমাজের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃতজ্ঞতা মানুষকে ছোট করে না; বরং তার ব্যক্তিত্বকে আরও মহৎ করে তোলে।

শিক্ষা, নৈতিকতা ও জীবনের প্রকৃত সাফল্য

পৃথিবীর ইতিহাসে বহু জ্ঞানী, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক তাঁদের শিক্ষা, অধ্যবসায় ও কর্মের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে অবদান রেখেছেন। তাঁদের জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে পরিশ্রম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
শুধু উচ্চশিক্ষিত হলেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে মহান হয়ে ওঠেন না। শিক্ষা যদি মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা সৃষ্টি না করে, দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে না তোলে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেককে সচেতন না করে, তবে সেই শিক্ষার মানবিক উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।

একজন শিক্ষিত মানুষের উচিত নিজের জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো। চিকিৎসক তাঁর সেবার মাধ্যমে, শিক্ষক তাঁর শিক্ষাদানের মাধ্যমে, কৃষক তাঁর শ্রমের মাধ্যমে, শ্রমিক তাঁর দক্ষতার মাধ্যমে এবং প্রশাসক তাঁর দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিতে পারেন। পেশা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সততা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার মূল্য সবার জন্য সমান।
তাই জীবনের সাফল্যকে কেবল অর্থ, পদমর্যাদা কিংবা খ্যাতির মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়। একজন মানুষ কতটা সৎ, কতটা দায়িত্বশীল এবং অন্যের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পেরেছেন, সেটিও তাঁর সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ।

গুরু ও পিতা-মাতার ঋণ:

কৃতজ্ঞতায় হোক জীবনের পূর্ণতা
পিতা-মাতা ও গুরুর অবদানকে কোনো নির্দিষ্ট হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাঁদের সম্মান করা, তাঁদের ভালো পরামর্শ গ্রহণ করা এবং নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা।

পিতা-মাতা যখন বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ানো সন্তানের মানবিক দায়িত্ব। তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা, তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনের সময়ে সহযোগিতা করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। একইভাবে, শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাঁর শ্রমের মর্যাদা দেওয়া এবং তাঁর কাছ থেকে অর্জিত জ্ঞানকে সৎ কাজে ব্যবহার করাও শিক্ষার্থীর দায়িত্ব।

তবে শ্রদ্ধা মানে অন্ধ আনুগত্য নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে যুক্তিবাদী, বিবেকবান ও সত্যসন্ধানী করে তোলে। কোনো ব্যক্তি ভুল করলে তা সম্মান বজায় রেখেই তুলে ধরা যায়। কারণ, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা—দুটিই মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জীবনে কখনো ঝড় আসবে, ব্যর্থতা গ্রাস করবে, প্রত্যাশা ভেঙে যাবে। সেই কঠিন সময়ে পিতা-মাতার ভালোবাসা মানুষকে মানসিক শক্তি জোগায়, আর গুরুর শিক্ষা তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধই মানুষকে প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদী থাকতে শেখায়।

জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক মানবজীবন

মানুষের জীবনে পিতা-মাতা ও গুরু এমন দুটি আশ্রয়, যাঁদের অবদান আলাদা হলেও লক্ষ্য এক—মানুষকে সুন্দর ও অর্থবহ জীবন গঠনে সহায়তা করা। পিতা-মাতা সন্তানের জীবনের ভিত্তি নির্মাণ করেন, আর শিক্ষক সেই ভিত্তির ওপর জ্ঞান, যুক্তি ও বিবেকের সৌধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।
তাই আসুন, আমরা পিতা-মাতাকে হৃদয়ের গভীর থেকে শ্রদ্ধা করি, শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দিই এবং তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া ভালো শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করি। অহংকারের পরিবর্তে বিনয়, বিদ্বেষের পরিবর্তে সহমর্মিতা, অসত্যের পরিবর্তে সত্য এবং স্বার্থপরতার পরিবর্তে মানবকল্যাণকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি।

মনে রাখতে হবে, গুরুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তাঁর শিক্ষাকে সম্মান করার মধ্যে, আর পিতা-মাতার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা তাঁদের ত্যাগের মর্যাদা দেওয়ার মধ্যে নিহিত। জ্ঞান হোক আমাদের শক্তি, নৈতিকতা হোক আমাদের পথনির্দেশক এবং মানবতা হোক আমাদের জীবনের মূল পরিচয়।
কারণ, যে জীবনে পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা, গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি মমত্ববোধ থাকে, সেই জীবনই হয়ে উঠতে পারে সত্যিকার অর্থে সুন্দর, সার্থক ও মহৎ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews