
একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সম্পদ নয়, তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আর সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সবচেয়ে প্রাণবন্ত, স্বপ্নবান ও সম্ভাবনাময় অংশ হলো শিক্ষার্থীসমাজ।
আজকের ছাত্রই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, গবেষক, উদ্যোক্তা, লেখক, সাংবাদিক, রাষ্ট্রনায়ক এবং সমাজের নেতৃত্বদানকারী মানুষ। তাই ছাত্রসমাজকে কেবল রাজনৈতিক মিছিলের সংখ্যা, স্লোগানের কণ্ঠ কিংবা ক্ষমতার খেলায় ব্যবহৃত হাতিয়ার হিসেবে দেখলে একটি জাতির ভবিষ্যৎকেই ছোট করা হয়।
ছাত্রশক্তি কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, কোনো দলের একচ্ছত্র অধিকারও নয়। ছাত্রশক্তি একটি জাতির বিবেক, তার স্বপ্ন এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা। সেই শক্তিকে জাগ্রত করতে হবে—কিন্তু অন্ধ আবেগে নয়; শিক্ষা, যুক্তি, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার আলোয়।
আজ তাই সময় এসেছে ছাত্রসমাজকে প্রশ্ন করার—তোমরা কি নিজের শক্তি চিনতে পেরেছ? তোমরা কি নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে রাখতে চাও? নাকি অন্যের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে নিজের স্বপ্ন, শিক্ষা ও সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিতে চাও?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অন্যায় ও সংকটের সময়ে ছাত্রসমাজ বহুবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভাষার অধিকার, শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—বিভিন্ন সময়ে তরুণদের সাহস ও আত্মত্যাগ জাতিকে পথ দেখিয়েছে। কিন্তু সেই গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতারও একটি কঠিন প্রশ্ন জড়িয়ে আছে—আজকের ছাত্র কি সত্যিই নিজের শক্তির মালিক, নাকি সে ধীরে ধীরে কারও রাজনৈতিক স্বার্থের পুতুলে পরিণত হচ্ছে?
রাজনীতিতে মত থাকবে, আদর্শ থাকবে, বিতর্ক থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ছাত্রজীবনের মূল উদ্দেশ্য যেন ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা না হয়ে যায়। পদ-পদবি, প্রভাব, অর্থ কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার মোহ যদি শিক্ষার জায়গা দখল করে নেয়, তবে ছাত্রশক্তি আর শক্তি থাকে না; তা পরিণত হয় ব্যবহৃত শক্তিতে।
একজন ছাত্রের হাতে বই থাকা উচিত, যুক্তি থাকা উচিত, স্বপ্ন থাকা উচিত। তার কণ্ঠে অন্যায়ের প্রতিবাদ থাকতে পারে, কিন্তু সেই প্রতিবাদ যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়। তার চোখে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ থাকার কথা, প্রতিশোধের আগুন নয়। তার হাতে কলম থাকতে পারে, পতাকা থাকতে পারে, সত্যের পক্ষে উচ্চারিত একটি দৃঢ় মুষ্টি থাকতে পারে—কিন্তু সেই হাত যেন কখনো নিরীহ মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়।
ছাত্রশক্তির সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সংখ্যা নয়, তার চরিত্র। হাজার মানুষের মিছিলের চেয়ে একজন সৎ, জ্ঞানী ও বিবেকবান ছাত্র অনেক বেশি শক্তিশালী। কারণ জ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, আর বিবেক তাকে ভুল পথে যেতে বাধা দেয়। তাই ছাত্রদের প্রথম দায়িত্ব শিক্ষা। ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষা কেবল পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা হলো সত্য-মিথ্যা আলাদা করার ক্ষমতা, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার সামর্থ্য, অন্যের মতকে সম্মান করার মানসিকতা এবং নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস। যে শিক্ষার্থী বই পড়ে কিন্তু মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা হারায়, সে শিক্ষিত হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী হয়ে উঠতে পারে না।
আজকের পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে এসেছে ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তি, অনলাইন উসকানি, ঘৃণার ভাষা এবং অন্ধ অনুসরণের নতুন ঝুঁকি। তাই বর্তমান ছাত্রশক্তির লড়াই শুধু রাজপথে নয়—মস্তিষ্কের ভেতরেও। মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই, অজ্ঞতার বিরুদ্ধে জ্ঞানের লড়াই, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে মানবিকতার লড়াই এবং হতাশার বিরুদ্ধে স্বপ্নের লড়াই।
কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন যদি ছাত্রদের নিয়ে কাজ করে, তাদের দায়িত্ব হওয়া উচিত ছাত্রদের শিক্ষা, নেতৃত্বের গুণ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা। ছাত্রদের ব্যবহার করে সংঘাত সৃষ্টি করা, প্রতিপক্ষ দমন করা কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই ছাত্ররাজনীতির মহৎ উদ্দেশ্য হতে পারে না।
ছাত্রকে কারও পুতুল হতে দেওয়া যাবে না। তার বিবেক বিক্রি করা যাবে না। তার ভবিষ্যৎ কোনো পদ-পদবি বা সাময়িক সুবিধার বিনিময়ে বন্ধক রাখা যাবে না। একজন প্রকৃত ছাত্র অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে—কিন্তু অন্যায় করে নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবে—কিন্তু নিজে দুর্নীতির সুবিধাভোগী হয়ে নয়। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে—কিন্তু অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করে নয়। গণতন্ত্রের কথা বলবে—কিন্তু ভিন্নমতকে দমন করে নয়। দেশপ্রেমের কথা বলবে—কিন্তু দেশবাসীর প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে নয়। দেশকে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো নিজেকে যোগ্য করে তোলা। একজন চিকিৎসক সততার সঙ্গে চিকিৎসা করলে, একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে পড়ালে, একজন প্রকৌশলী দায়িত্বশীলভাবে কাজ করলে, একজন কৃষিবিজ্ঞানী নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলে, একজন উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলে—তাঁরাও দেশসেবাই করেন। তাই দেশপ্রেম শুধু স্লোগানে নয়; দেশপ্রেম মানুষের কাজে, সততায় এবং দায়িত্ববোধে প্রকাশ পায়।
আজ প্রয়োজন এমন ছাত্রশক্তি, যারা প্রশ্ন করবে কিন্তু অশ্রদ্ধা করবে না; প্রতিবাদ করবে কিন্তু ধ্বংস করবে না; নেতৃত্ব দেবে কিন্তু আধিপত্য বিস্তার করবে না; সংগঠিত হবে কিন্তু অন্ধ অনুসারী হবে না। তারা রাজনীতি বুঝবে, কিন্তু রাজনীতির নামে নিজের শিক্ষা ও চরিত্র নষ্ট করবে না।
তরুণদের মনে রাখতে হবে—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পদ-পদবি চিরস্থায়ী নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ও চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু একজন মানুষের চরিত্র, শিক্ষা ও কর্মের মূল্য দীর্ঘস্থায়ী। আজ যে ছাত্র অন্যের ইশারায় চলে, আগামীকাল সে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই হারাতে পারে। আর যে ছাত্র আজ সত্যকে ধারণ করে, যুক্তিকে সম্মান করে এবং নিজেকে গড়ে তোলে, আগামীকাল সে সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
তাই এসো, ছাত্রসমাজকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করি। ছাত্র মানে শুধু পরীক্ষার্থী নয়; ছাত্র মানে অনুসন্ধানী মন। ছাত্র মানে শুধু মিছিল নয়; ছাত্র মানে চিন্তার শক্তি। ছাত্র মানে শুধু স্লোগান নয়; ছাত্র মানে যুক্তির কণ্ঠ। ছাত্র মানে শুধু কোনো দলের কর্মী নয়; ছাত্র মানে দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক।
ওঠো নবীন প্রজন্ম—কিন্তু কারও বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এগিয়ে চলো—কিন্তু কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে। শক্ত হও—কিন্তু মানুষের ওপর শক্তি প্রয়োগের জন্য নয়, নিজের দুর্বলতাকে জয় করার জন্য।
তোমাদের হাতে বই থাকুক, চোখে স্বপ্ন থাকুক, হৃদয়ে দেশ থাকুক এবং বিবেকে সত্য থাকুক। শিক্ষা, শৃঙ্খলা, সততা ও মানবিকতা হোক তোমাদের পথচলার মূলমন্ত্র। তোমরা কারও হাতের পুতুল নও। তোমরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তোমাদের শক্তি যদি জ্ঞান ও নৈতিকতার শক্তি হয়, তবে সেই শক্তিকে কোনো অপশক্তি সহজে পরাজিত করতে পারবে না।
জয় হোক জ্ঞানের, জয় হোক সত্যের, জয় হোক মানবতার। জাগুক ছাত্রশক্তি—পুতুল হয়ে নয়, মানুষ হয়ে। আর সেই মানুষের হাতেই গড়ে উঠুক একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক
দ.ক.২৬