1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
শিক্ষার্থীরা কি শিখছে, নাকি মুখস্থের ফাঁদে বন্দি হচ্ছে? ছাত্র তুমি পুতুল নও—তুমিই ভবিষ্যৎ আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব জি কে গউছ বাহুবলে ফুটবল ম্যাচের জেরে টর্চলাইটের আলোয় সংঘর্ষ, আহত অন্তত ৫০ জন সীমান্ত নিরাপত্তায় ডিজিটাল নজরদারি জোরদার শায়েস্তাগঞ্জে শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত  অনুমোদন নেই, তবুও চলছে ছাতিয়াইন বাজারে আইসক্রিম উৎপাদন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা বাড়ানো হবে আহম্মদাবাদের ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা সুজয় দাশের বদলি চুনারুঘাটে অবৈধ ৭টি করাত কল সিলগালা করল ভ্রাম্যমান আদালত

শিক্ষার্থীরা কি শিখছে, নাকি মুখস্থের ফাঁদে বন্দি হচ্ছে?

মো: রফিকুল ইসলাম তালুকদার
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। সেখানে যে শিশু আজ বই খুলে বসেছে, আগামী দিনে সেই শিশুই হবে সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। তাই শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কি শুধু পরীক্ষায় সফল শিক্ষার্থী তৈরি করছি, নাকি এমন মানুষ তৈরি করছি, যারা চিন্তা করতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে?

বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেড়েছে, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটি গভীর প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে।

শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই শিখছে? নাকি তারা শুধু পরীক্ষার কৌশল শিখছে?

একজন শিক্ষার্থী যদি একটি অধ্যায় মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায়, কিন্তু সেই জ্ঞান বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করতে না পারে, নতুন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে না পারে,তাহলে সেই শেখাকে কি প্রকৃত শিক্ষা বলা যাবে?

আজকের পৃথিবীতে জ্ঞান দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে শুধু তথ্য মনে রাখার দক্ষতা দিয়ে সফল হওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন মানুষ, যারা শিখতে জানে, ভাবতে জানে এবং নতুন সমাধান তৈরি করতে পারে।

এই বাস্তবতায় বিশ্বের শিক্ষা অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে লার্নিং ক্রাইসিস বা শিখন সংকট—যেখানে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

তাই এখন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন? আমরা কি শিক্ষার্থী তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষার্থী তৈরি করছি? এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, নারী শিক্ষার প্রসার, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বৃদ্ধি—এসব ক্ষেত্রে সাফল্য রয়েছে; কিন্তু এখন প্রয়োজন শিক্ষার গভীরতা নিয়ে ভাবা।

কারণ স্কুলিং এবং লার্নিং এক বিষয় নয়।

বিদ্যালয়ে থাকা হলো একটি সুযোগ; কিন্তু শেখা হলো তার ফল। একজন শিক্ষার্থী একটি অধ্যায়ের সংজ্ঞা মুখস্থ করে পরীক্ষায় লিখতে পারে। কিন্তু কয়েক মাস পর যদি সেই ধারণা ব্যাখ্যা করতে না পারে বা বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে না পারে, তাহলে সেটি গভীর শিখন নয়।

আজকের পৃথিবীতে তথ্য মুখস্থ রাখার মূল্য দ্রুত কমছে। কারণ তথ্য এখন সহজেই পাওয়া যায়; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—

তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা, যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষমতা, নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা। অনেক সময় শিক্ষার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ভালো ফল অর্জন।

ফলে শিক্ষার্থী শেখে- কোন প্রশ্ন পরীক্ষায় আসতে পারে, কোন উত্তর মুখস্থ করলে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে, কীভাবে পরীক্ষার খাতায় ভালো লেখা যাবে।

কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষার্থী চিন্তা করতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে এবং নতুন পরিস্থিতিতে জ্ঞান ব্যবহার করতে শেখে।

শিক্ষাবিদ বেঞ্জামিন ব্লুম দেখিয়েছেন, শেখার সর্বনিম্ন স্তর হলো তথ্য মনে রাখা। এর পর রয়েছে বোঝা, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও সৃষ্টি।

দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষা এখনো মুখস্থের প্রথম স্তরেই বেশি আটকে আছে।

একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেই সে দক্ষ হয়ে উঠেছে এ ধারণা পরিবর্তন করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবী শুধু ভালো পরীক্ষার্থী চায় না; চায় ভালো চিন্তক, উদ্ভাবক ও সমস্যা সমাধানকারী।

শ্রেণিকক্ষ বদলাতে হবে: শিক্ষার্থীকে সক্রিয় করতে হবে। শিখন সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো অনেক শ্রেণিকক্ষে এখনো শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষণ পদ্ধতির আধিপত্য।

শিক্ষক বলছেন, শিক্ষার্থী শুনছে। শিক্ষক ব্যাখ্যা করছেন, শিক্ষার্থী লিখছে। শিক্ষক উত্তর দিচ্ছেন, শিক্ষার্থী মুখস্থ করছে। এই পদ্ধতিতে তথ্য দেওয়া সম্ভব; কিন্তু গভীর শেখা সবসময় সম্ভব নয়।

আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান বলছে, শিক্ষার্থী যত বেশি সক্রিয়ভাবে শেখার সঙ্গে যুক্ত হবে, তার শেখা তত বেশি স্থায়ী হবে।

প্রয়োজন আলোচনা; প্রশ্নোত্তর; দলগত কাজ; প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা; বাস্তব সমস্যা সমাধান।

জন ডিউইয়ের ‘Learning by Doing’ ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় কাজের মাধ্যমে শেখা সবচেয়ে কার্যকর শেখার একটি পথ।

শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার অধিকার, ভুল করার সুযোগ এবং নতুন ধারণা প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে শিক্ষক পাঠদাতা নয়, তিনি শেখার একজন স্থপতি। শিক্ষার মান উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন শিক্ষক। কোনো পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি বা নীতি শিক্ষক ছাড়া কার্যকর হতে পারে না।

বর্তমান যুগে শিক্ষক শুধু তথ্য প্রদানকারী নন। তাকে হতে হবে লার্নিং ডিজাইনার, ফ্যাসিলিটেটর, মেন্টর ও রিফ্লেক্টিভ প্র্যাকটিশনার।

একজন আধুনিক শিক্ষককে জানতে হবে শিক্ষার্থী কীভাবে শেখে; বিভিন্ন শিক্ষার্থীর শেখার পার্থক্য কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়; প্রযুক্তিকে কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়;

কীভাবে শ্রেণিকক্ষে সক্রিয় শেখার পরিবেশ তৈরি করা যায়। এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন। এককালীন প্রশিক্ষণ দিয়ে একজন শিক্ষককে পরিবর্তিত যুগের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়।

শিক্ষক নিজেও একজন আজীবন শিক্ষার্থী—এই সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মৌলিক সত্য হলো যা মূল্যায়ন করা হয়, শিক্ষার্থীরা সেটিই গুরুত্ব দিয়ে শেখে। যদি পরীক্ষায় শুধু মুখস্থ জ্ঞান যাচাই করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরাও মুখস্থ করবে। তাই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। মূল্যায়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত

শিক্ষার্থী কী বুঝেছে; কোথায় সমস্যা হচ্ছে; কীভাবে আরও উন্নতি করা যায়।

প্রয়োজন বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন; প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন; বাস্তব কাজের মূল্যায়ন; নিয়মিত ফিডব্যাক। নম্বর থাকবে; কিন্তু নম্বরই শিক্ষার একমাত্র পরিচয় হবে না।

বাংলাদেশের জন্য করণীয়: শিখন সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে প্রথমত, শিক্ষার সাফল্যের মানদণ্ড পরিবর্তন করতে হবে। শুধু পাসের হার নয়, শিখনফলকে প্রধান সূচক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক স্তরে ভাষা ও গণিতের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। কারণ দুর্বল ভিত্তি পরবর্তী শিক্ষাজীবনে বড় সমস্যা তৈরি করে। তৃতীয়ত, শিক্ষক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যালয়কে একটি লার্নিং কমিউনিটি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই শেখার অংশীদার হবে। পঞ্চমত, প্রযুক্তিকে শুধু প্রদর্শনের উপকরণ নয়, শেখার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় না শুধু কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো বা কতজন সর্বোচ্চ নম্বর পেল তার মাধ্যমে। প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় কতজন শিক্ষার্থী নিজের চিন্তা দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে, নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী হয় এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় তার মাধ্যমে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সনদ একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তির প্রমাণ হতে পারে; কিন্তু তার সক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও শেখার ক্ষমতাই তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হতে হবে না শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা বরং হতে হবে জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়া। এখন সময় এসেছে শিক্ষা দর্শনের একটি মৌলিক পরিবর্তনের মুখস্থ থেকে মননে, তথ্য থেকে প্রজ্ঞায়, পরীক্ষা থেকে দক্ষতায়, সনদ থেকে সক্ষমতায়। শিক্ষার্থীদের আমরা কী শিখাচ্ছি এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা সত্যিই শিখছে কি না। কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্ভর করবে শুধু কতজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে গেছে তার ওপর নয়; বরং কতজন শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে সত্যিকার অর্থে শিখেছে তার ওপর। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার আয়নায় আমাদের বারবার ফিরে তাকাতে হবে এবং সাহসের সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই শিখছে, নাকি শুধু পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ

দ.ক.সিআর.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews