
চুমারুঘাট উপজেলায় বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিং এর কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন। প্রচণ্ড গরমে এমন বিদ্যুতহীনতায় নাকাল উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের বাসিন্দারা। বিদ্যুতের যাওয়া-আসার খেলায় দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে মানুষের বেঁচে থাকা। সুস্থ মানুষের হাঁসফাঁস সহ্য করা গেলেও রোগীদের আর্তচিৎকার আর প্রবীণদের হা-হুতাশে পীড়াদায়ক হয়ে পড়েছে জীবন। প্রতিদিনের এমন লোডশেডিং-এ ব্যহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবন যাপন। এ থেকে সহসাই মুক্তি মেলার কোনো উপায়ও খোঁজে পাচ্ছেন না পল্লী বিদ্যুতের কাছে ‘জিম্মি’ থাকা মানুষেরা। এতে ক্রমশ ক্ষোভ বাড়ছে উপজেলার গ্রাহকদের মাঝে। যে কোনো মুহুর্তে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও ঘটতে পারে উপজেলার রাজপথে। এর আগেই বিদ্যুতের ভেল্কিবাজির স্থায়ী সমাধান চান স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদ্যুৎ বণ্টনের সুবিধার্থে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রামকে ৬টি ফিডারে ভাগ করেছে উপজেলা পল্লী বিদ্যুত। এসব ফিডারের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৩৬ হাজার। দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুত পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। প্রত্যন্ত এলাকার তুলনায় একেবারে নাকাল দুর্গম গ্রামের বাসিন্দাদের জীবন। উপজেলা সদর এলাকা এক নম্বর ফিডারের সেবা গ্রহণ করে থাকেন। এখানে আুমারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ, থানাসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় বিশেষ বিদ্যুত সেবা পেয়ে থাকে এই এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো বা বাসিন্দারা। আর অন্যান্য ফিডারে ‘সচরাচর’ ধারায় চালিয়ে নিতে হয়।
এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলার পল্লী বিদ্যুতের একাধিক গ্রাহক। তারা জানিয়েছেন, এখন স্কুল কলেজে পরীক্ষা চলছে। এমন অবস্থায় এইচএসসি পরীক্ষা প্রায় শেষ হলো। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। ডিগ্রি পরীক্ষাও চলমান, সামনে অনার্স ২য় বর্ষের পরীক্ষাও শুরু হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারছেন না। রোগীরা আরো রোগী হয়েছে পড়ছেন। বিশেষ করে বিদ্যুত নির্ভর ব্যবসায়ীরা এমন অবস্থায় সব চেয়ে বড় বিপদে রয়েছেন।
কম্পিউটার কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা জানান, তাদের ব্যবসার শতভাগ অংশ বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল। আইপিএস ব্যবহার করেও ব্যবসা করতে পারছেন না। আইপিএসের চার্চ শেষ হয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন চার্জ করানো যাচ্ছে না। ফটোকপির মেশিন অন করাই যাচ্ছে না। অনেকে ব্যবসায়ীর দৈনিক, মাসিক কিস্তি রয়েছে। বিদ্যুত না থাকায় আয় নেই, আর পর্যাপ্ত পরিমান আয় না থাকায় কিস্তি ও সংসার খরচ নিয়ে তারা বেশ বিপাকে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
এ দিকে শিক্ষার্থীরা বলেছেন, গত বৃহস্পতিবার আমাদের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পুরোটা পরীক্ষায় বিদ্যুত বিভ্রাটের জন্য ভালো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে ভীষণ গরমও পড়েছে। আমরা আহ্বান করবো, যেহেতু লোডশেডিংটা সারা দেশে হচ্ছে সুতরায় সরকারকে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। প্লিজ, এমন অসহনশীল গরমে আমাদেরকে লোডশেডিং থেকে মুক্তি দিন।
মিরাশী ইউনিয়নের এক মহিলা তাঁর বোনকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন চার দিন। ভীষণ গরম আর মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং এর কারণে অতিষ্ঠ ছিলেন তারাও।
উপজেলার আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের রাজার বাজার এলাকার রোমান, রেজ্জাক, রাণীরকোর্ট এলাকার টেনু, পশ্চিম বগাডুবির করিম ও সুলতান আহমদ বলেছেন, আমরা অতিষ্ঠ, খুব অতিষ্ঠ। যেকোনো মুহুর্তে বিদ্যুতের দাবিতে রাস্তায় আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো। এভাবে আর চলা যায় না। দিনের বেশিরভাগ সময় কারেন্ট থাকে না। মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম লোকসান হচ্ছে। রোগীরা হা-হুতাশ করছেন। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছেন না। রাতে ঘুমানো যায় না। জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
চুনারুঘাট পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এই মুহূর্তে উপজেলায় প্রায় গড়ে ৫০ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। প্রতিদিন প্রতি ঘন্টায় ৪০-৪৯ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। কখনো কখনো এরচেয়ে বেশি হচ্ছে।
সূত্র জানিয়েছে, উপজেলায় এখন সাড়ে ৬ থেকে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন কিন্তু তারা সাপ্লাই পাচ্ছেন আড়াই থেকে ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুত। এ দিয়েই ঘন্টা অন্তর অন্তর লোডশেডিং করে চালিয়ে নিচ্ছেন তারা। সারা জেলায় প্রায় ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন থাকলেও পল্লী বিদ্যুত পাচ্ছে ৩০ থেকে ৩৪ মেগাওয়াট। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুত কার্যালয়ের কিছুই করার নেই বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি না পেলে সহসাই এই সমস্যা কাটছে না বলে জানিয়েছে সূত্রটি।
কেন এমন সমস্যার তৈরি হচ্ছে জানতে চাইলে চুনারুঘাট পল্লী বিদ্যুতের এজিএম মোঃ জোয়েল-উর- রহমান জানিয়েছেন, লোডশেডিং এখন জাতীয় সমস্যা। জাতীয় গ্রিডে উৎপাদে ঘাটতি থাকায় আমরা চাহিদা মতো সাপ্লাই পাচ্ছি না। দিন-রাতের প্রায় অর্ধেক সময় বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তাছাড়া উপজেলা সদরে ইমার্জেন্সি সার্ভিস থাকায় সেদিকটাও মাথায় রেখে চলতে হয়। এইসব প্রতিষ্ঠানের আবার জেনারেটর ব্যবস্থা নেই। মূলত জেনারেশনে ঘাটতি থাকায় বিদ্যুত কম পাচ্ছি। এগুলো দিয়েই চলছে। এক ঘন্টা লাইন চালু থাকলে এক ঘন্টা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই সমস্যা সমাধান হতে পারে।
দ.ক.সিআর