
বর্তমান সময়ে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের জীবন পড়াশোনা, পরীক্ষা, কোচিং, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যস্ততায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এর ফলে অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভালো ফল নয়, একজন শিক্ষার্থীর সুস্থ শরীর, সুন্দর মানসিকতা, ভালো অভ্যাস এবং দক্ষতা অর্জনের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
১. নিয়মিত রুটিন ও ডিজিটাল ভারসাম্য
ভোরে ঘুম থেকে ওঠা এবং রাতে সময়মতো ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সময়ের সীমা নির্ধারণ করতে হবে। এবং পড়াশোনার সময় মোবাইল ফোন দূরে রাখা বা সাইলেন্ট মোডে রাখা উচিত।
২. সেলফ-স্টাডি ও দক্ষতা উন্নয়ন
কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিদিন ৩–৪ ঘণ্টা নিজে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে পাঠ বুঝে পড়লে আলাদা কোচিংয়ের প্রয়োজন অনেকটাই কমে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা নতুন কিছু শেখার জন্য সময় রাখা উচিত।
বাংলা ও ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা, প্রেজেন্টেশন স্কিল, টাইপিং, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল ও পাওয়ারপয়েন্টের মতো মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন।
৩. পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্প, উপন্যাস, জীবনী, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত সংবাদপত্র পড়লে সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কে ধারণা বাড়ে। খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্কাউটিং, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজসহ সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া উচিত। এসব কার্যক্রম নেতৃত্বের গুণ, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে।
৪. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাস কমাতে হবে।
বাসা থেকে ডিম, ফল, স্যান্ডউইচ বা অন্যান্য পুষ্টিকর টিফিন নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. নিয়মিত শরীরচর্চা ও খেলাধুলা
প্রতিদিন অন্তত ২০–৩০ মিনিট হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো বা ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম করা উচিত। খেলার মাঠ না থাকলেও বাসার ছাদ বা ঘরেই শরীরচর্চা করা সম্ভব। নিয়মিত খেলাধুলা শরীরকে সুস্থ রাখে, মানসিক চাপ কমায় এবং মনোযোগ বাড়ায়।
৬. মানসিক সুস্থতা
পরীক্ষা বা ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ। হতাশা, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ অনুভব করলে তা পরিবার, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত।
পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের শখ, পরিবার ও বন্ধুদের জন্যও সময় রাখা প্রয়োজন।
৭. ভালো অভ্যাস, মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ব: সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান এবং ছোটদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং মানবিক মূল্যবোধ চর্চার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুল-কলেজের সময়টিই একজন মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। তাই শুধু জিপিএ ৫ বা পরীক্ষার ফলের পেছনে না ছুটে, নিয়মিত পড়াশোনা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা, বই পড়া, খেলাধুলা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং নতুন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে একজন সুস্থ, দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই একজন শিক্ষার্থীর আদর্শ জীবনযাপনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
দ.ক.সিআর