1. live@kaalnetro.com : Bertemu : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

অবৈধ ড্রেজারের দাপটে বিপন্ন চুনারুঘাট !

দৈনিক কালনেত্র
  • প্রকাশিত: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

 

আসাদ ঠাকুর : চুনারুঘাট উপজেলার আমকান্দি, কাছুয়া, রাজার বাজার ও বনগাওসহ উপজেলার খোয়াই ও সুতাংছড়ায় অবৈধভাবে শক্তিশালী ‘বোমা’ মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান, জরিমানা ও ড্রেজার জব্দের ঘটনাও থামাতে পারছে না এই অবৈধ কর্মকাণ্ড।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়িদের একটি চক্র পরিবেশ ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনে এই অবৈধ ড্রেজার ব্যবহার করে আসছে, যার ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে খোয়াই নদীর চুনারুঘাট অংশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নদীতে শক্তিশালী ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালুর একটি অংশ স্থানীয় সড়ক নির্মাণ, ভরাট কাজ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত বালুমহাল থেকে বালু সংগ্রহ না করে খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলেও কারও কারও দাবি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করলে জলাশয়ের তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর হয়ে যায়, পাড় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভাঙনের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাসুল্লার বাসিন্দা ওলিউর রহমান বলেন, অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র বালু উত্তোলন করে সড়ক নির্মাণ কাজে ব্যবহার করছে। সড়ক নির্মাণে বালু সরবরাহের জন্য বাজেটে নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যে অবৈধ উপায়ে বালু সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে সড়কের মান ও স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, কৃষিজমির পাশ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে জমি দেবে যাচ্ছে। কয়েক বিঘা জমিতে আগের মতো ফলন হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বো আমরা কৃষকরা।

বনগাঁও আশ্রয়ণের গৃহবধূ রেহানা বেগম বলেন, বোমা মেশিনের বিকট শব্দে শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। দিন-রাত শব্দের কারণে মানুষ মানসিকভাবে বিরক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক সময় বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরাও চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে গেছে।

জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির নেতা মনির হোসেন বলেন, অবৈধ ড্রেজিং শুধু পরিবেশের জন্য নয়, পুরো জনপদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। কৃষিজমি, বসতবাড়ি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্য-সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি বালু উত্তোলনে অবৈধ ড্রেজার ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।

বাপার নবনির্বাচিত জেলা কমিটির নেতা সিদ্দিকি হারুণ বলেন, বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী কোথাও ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও জনবসতির নিকটবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলন করলে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জব্দ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত না হওয়ায় অসাধু চক্র বারবার একই অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে নদীর গভীরতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে, এতে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা।

পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে চুনারুঘাটে খোয়াই নদীর বিভিন্ন অংশে নদীভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কৃষিজমি হারিয়ে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামীণ অর্থনীতি। একই সঙ্গে বসতভিটা হারিয়ে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিতে পারে।

প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ ড্রেজার জব্দ, জরিমানা ও কারাদণ্ড প্রদান করলেও এলাকাবাসীর দাবি, স্থায়ীভাবে এই অপতৎপরতা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চুনারুঘাটের খোয়াই নদী সংশ্লিষ্ট জনপথের কৃষিজমি, বসতভিটা, জলাশয় ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। ইজারার নামে চলা এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ পরিবেশগত ও মানবিক সংকট অপেক্ষা করছে।

লেখা: আসাদ ঠাকুর, কবি, লেখক ও সাংবাদিক

দ.ক.সিআর.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট