
সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা, যাকে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থার অসংগতি তুলে ধরে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য।
এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সততা, নৈতিকতা, সাহস এবং দায়বদ্ধতা। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে মফস্বল বা স্থানীয় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি সাধারণ ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে—অনেকেই মনে করেন, সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের কোনো প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ সাংবাদিকতার বৈশ্বিক ও তাত্ত্বিক মানদণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাংবাদিকতা করতে প্রেসক্লাবের সদস্য পদ কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়; বরং একজন সাংবাদিকের মূল ও একমাত্র ভিত্তি হলো তার পেশাগত পরিচয়, কাজের দক্ষতা এবং নৈতিকতা।
এই বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণের আগে আমাদের বুঝতে হবে প্রেসক্লাব আসলে কী এবং এর উদ্দেশ্য কী। প্রেসক্লাব মূলত সাংবাদিকদের একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক সংগঠন। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সাংবাদিকরা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি, পেশাগত উন্নয়ন, মতবিনিময় এবং বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যেই প্রেসক্লাব গঠন করেন। এটি এক ধরনের ‘প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং হাব’ বা গিল্ড।
চিকিৎসকদের জন্য যেমন ‘মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল’ বা আইনজীবীদের জন্য যেমন ‘বার কাউন্সিল’ রয়েছে, যারা পেশাগত সনদ বা লাইসেন্স প্রদান করে, প্রেসক্লাব মোটেও তেমন কোনো আইনি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়। প্রেসক্লাবের কোনো এখতিয়ার নেই কাউকে সাংবাদিক হিসেবে সনদ দেওয়ার বা কারও সাংবাদিকতা করার অধিকার কেড়ে নেওয়ার। এটি কেবলই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যেখানে নির্দিষ্ট শর্তপূরণ সাপেক্ষে সাংবাদিকরা সদস্য হতে পারেন।
তাহলে একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় কী? একজন ব্যক্তি সাংবাদিক কি না, তা নির্ধারিত হয় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পেশাগত মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করে-
১. প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও নিয়োগপত্র: একজন সাংবাদিক কোনো না কোনো স্বীকৃত গণমাধ্যমে (প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক বা নিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল) কাজ করেন। সেই প্রতিষ্ঠানের দেওয়া নিয়োগপত্র এবং পরিচয়পত্রই (ID Card) তার প্রাথমিক পেশাগত স্বীকৃতি।
২. পেশাগত দক্ষতা ও কাজ: সাংবাদিকের মূল পরিচয় তার কলম, কি-বোর্ড বা ক্যামেরায়। তিনি নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ করেন, রিপোর্ট লেখেন এবং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরেন। তার প্রকাশিত বা প্রচারিত সংবাদই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণপত্র।
৩. নৈতিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা: সাংবাদিকতার কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা ‘কোড অব এথিকস’ রয়েছে। সত্যনিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা এবং জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়াই একজন পেশাদার সাংবাদিকের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
৪. রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: বাংলাদেশে তথ্য অধিদপ্তরের (PID) অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডকে সরকারিভাবে সাংবাদিকতার একটি বড় স্বীকৃতি হিসেবে ধরা হয়। এটি সরকার প্রদান করে, কোনো প্রেসক্লাব নয়।
সুতরাং, একজন সাংবাদিকের যদি তার নিজ প্রতিষ্ঠানের বৈধ পরিচয়পত্র থাকে এবং তিনি যদি বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ চর্চা করেন, তবে কোনো ক্লাবের সদস্য না হলেও তিনি শতভাগ পেশাদার সাংবাদিক।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেসক্লাবগুলোকে এক প্রকার ‘লাইসেন্সিং অথরিটি’ বা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে কেউ প্রেসক্লাবের সদস্য না হলে তাকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ বলে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়। আবার উল্টো চিত্রও আছে— সাংবাদিকতার সাথে ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই, এমন অনেক প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ব্যক্তি কেবল প্রভাব খাটিয়ে প্রেসক্লাবের সদস্যপদ বাগিয়ে নেন এবং সেই কার্ড ব্যবহার করে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে জাহির করে অনৈতিক সুবিধা আদায় করেন।
এই সিন্ডিকেট বা আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা প্রকৃত সাংবাদিকতার পথে একটি বড় অন্তরায়। এর ফলে তরুণ, সৎ এবং স্বাধীন সাংবাদিকরা অনেক সময় তথ্য সংগ্রহে বাধার সম্মুখীন হন। সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরগুলোতেও অনেক সময় ভুলবশত প্রেসক্লাবের কার্ডকে সাংবাদিকতার বৈধতা হিসেবে চাওয়া হয়, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত এবং পেশাগত বৈষম্যের শামিল।
বর্তমান যুগ ডিজিটাল মিডিয়ার যুগ। সাংবাদিকতার পরিধি এখন আর কেবল সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা, ডেটা জার্নালিজম, ইনভেস্টিগেটিভ ব্লগিং এবং সিটিজেন জার্নালিজমের যুগে সাংবাদিকের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে। একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হয়তো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন, কিন্তু তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত তথ্যবহুল রিপোর্ট করছেন। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করা এই সাংবাদিকদের হয়তো কোনো ক্লাবের সদস্যপদ নেই, কিন্তু তাই বলে তাদের সাংবাদিক সত্তাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ডিজিটাল এই যুগে কে কোন ক্লাবের সদস্য, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কে কতটা দ্রুততার সাথে, কত নিখুঁত ও সত্য তথ্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতা বা ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ রোধ করা অবশ্যই জরুরি। তবে এর সমাধান প্রেসক্লাবগুলোর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মাঝে নেই। অপসাংবাদিকতা রোধে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে ‘বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল’। এছাড়া গণমাধ্যমগুলোর নিজস্ব শক্তিশালী এডিটোরিয়াল প্যানেল থাকতে হবে, যারা তাদের কর্মীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করবে। রাষ্ট্র এবং প্রশাসনকে বুঝতে হবে যে, একজন সংবাদকর্মীর মূল বৈধতা তার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং তার প্রকাশিত সংবাদ। তথ্য অধিকার আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে যেকোনো পেশাদার সাংবাদিক (তিনি ক্লাবের সদস্য হোন বা না হোন) নির্বিঘ্নে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
প্রেসক্লাবগুলো তাদের মূল জায়গায় ফিরে গিয়ে সাংবাদিকদের মানোন্নয়ন, প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন, অসুস্থ সাংবাদিকদের চিকিৎসায় সহায়তা এবং পেশাগত সুরক্ষায় কাজ করতে পারে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) প্রেসক্লাবই পারে প্রকৃত সাংবাদিকদের এক ছাতার নিচে আনতে, তবে তা কখনোই জবরদস্তিমূলক বা বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে নয়।
পরিশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতা কোনো ক্লাবের চার দেয়ালে আবদ্ধ বিষয় নয়; এটি একটি চলমান বুদ্ধিবৃত্তিক ও অনুসন্ধানমূলক প্রক্রিয়া। একজন সাংবাদিক তার মেধা, শ্রম, সততা ও সাহসিকতা দিয়ে সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করেন। তিনি জনগণের কণ্ঠস্বর। এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য একটি বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র এবং পেশাদারিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাই যথেষ্ট। প্রেসক্লাবের সদস্যপদ একজন সাংবাদিকের সামাজিক পরিচিতি ও নেটওয়ার্ক বাড়াতে সাহায্য করতে পারে মাত্র, কিন্তু এটি কখনোই সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত বা বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হতে পারে না। পেশাগত উৎকর্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ কাজের মাধ্যমেই একজন সাংবাদিক সমাজে তার নিজের আসন তৈরি করে নেন। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, অন্য কোনো ক্লাবের সিলমোহর নয়।
লেখক: শফিউল বারী রাসেল (কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক)