1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১৯ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
প্রকৃতি আছে, পরিকল্পনা নেই: পর্যটনে পিছিয়ে বাহুবল বিষাক্ত সাপ নিয়ে বিপাকে হবিগঞ্জ বন বিভাগ উন্নয়ন বরাদ্দে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে: এমপি ফয়সল চুনারুঘাটে ভূমি বিষয়ক কর্মশালা ও কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত চুনারুঘাটে সংরক্ষিত বনে গাছ কাটার সময় দুইজন আটক, কাঠ ও ট্রাক্টর জব্দ শায়েস্তাগঞ্জে পিকআপ-কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ সব সম্পর্কের দায় নয়, নিজের আত্মমর্যাদা এবং শান্তিও জরুরী  প্রিয়জন নাকি প্রয়োজন? বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা, সম্পদের মোহ ও জীবনের নির্মম বাস্তবতা চুনারুঘাটে গাজীপুর হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে এইচএসসির ফল বিপর্যয়, পাসের হার ৩২.৪১ শতাংশ হযরত মুজিবুর রহমান (জলফু মিয়া) পীর সাহেবের ৯ম বার্ষিক ওরস শরিফ আগামীকাল 

প্রকৃতি আছে, পরিকল্পনা নেই: পর্যটনে পিছিয়ে বাহুবল

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

পাহাড়, টিলা, চা-বাগান, রাবার বাগান, হাওর, পাহাড়ি ছড়া আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনা—প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদের এমন বৈচিত্র্যময় সমাহার রয়েছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায়। অথচ বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও প্রচারের অভাবে পর্যটন মানচিত্রে এখনো প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি উপজেলাটি। প্রকৃতি যেন এখানে অকৃপণ হাতে সৌন্দর্য বিলিয়েছে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে পর্যটন শিল্পে রূপ দেওয়ার কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়ে গেছে।

উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে নানা দর্শনীয় স্থান। ভাদেশ্বর ইউনিয়নের কামাইছড়া থেকে মুছাই এলাকা পর্যন্ত পাহাড়ি টিলা, সবুজ বনভূমি, চা-বাগান ও রাবার বাগানের মনোরম দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া ও ঘুঙ্গিয়াজুরি হাওরের জলরাশি এ অঞ্চলের সৌন্দর্যে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। শীত মৌসুমে সবুজ পাহাড়, চা-বাগান ও নির্মল পরিবেশ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য তৈরি করতে পারে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা।

কিন্তু সম্ভাবনাময় এসব এলাকায় পর্যটকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, নির্ধারিত পর্যটন জোন, বিশ্রামাগার, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনেক জায়গায় যাতায়াতের পথও পর্যটকবান্ধব নয়। ফলে দর্শনার্থীদের নিজেদের উদ্যোগেই গন্তব্য খুঁজে নিতে হয়। কোথাও কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ পথে প্রবেশ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

বাহুবলের উল্লেখযোগ্য পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে পুটিজুরীর দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট, রুপাইছড়া রাবার বাগান, রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডসংলগ্ন প্রাকৃতিক এলাকা, আলিয়া খাসিয়াপুঞ্জি, বিভিন্ন চা-বাগান, কামাইছড়া ও মুছাই এলাকার পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশ। এ ছাড়া রয়েছে শ্রী শ্রী হরিবল ঠাকুরের মন্দির, শ্রী শ্রী শচী অঙ্গন মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা।

পুটিজুরী এলাকায় অবস্থিত দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থাপনা। অন্যদিকে রুপাইছড়া রাবার বাগানের সবুজ পরিবেশ এবং রশিদপুর, বৃন্দাবন, ফয়জাবাদ, কেদারপুর ও আমতলী চা-বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রাখে। মিরপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কের মুছাই এলাকা থেকে ভেতরে অবস্থিত আলিয়া খাসিয়াপুঞ্জি স্থানীয় সংস্কৃতি ও পাহাড়ি জনজীবন সম্পর্কে জানারও সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এসব এলাকায় পর্যটকদের প্রবেশ, ছবি তোলা ও ঘোরাফেরার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং পরিবেশের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।

বাহুবলের পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঐতিহাসিক ফয়জাবাদ বধ্যভূমি। উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নে রশিদপুর চা-বাগান ও গ্যাস ফিল্ডসংলগ্ন ফয়জাবাদ হিল এলাকায় অবস্থিত এ বধ্যভূমি মহান মুক্তিযুদ্ধের এক বেদনাবিধুর স্মারক।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে ধরে এনে নির্যাতনের পর ফয়জাবাদ হিল এলাকায় হত্যা করত। স্বাধীনতার পর সেখানে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল পাওয়া যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এ বধ্যভূমিতে নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ এ স্মৃতিস্থানের যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বধ্যভূমির স্মৃতিচিহ্ন ও স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, তথ্যসমৃদ্ধ ফলক এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের এ ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফয়জাবাদ বধ্যভূমিকে সংরক্ষণ, সংস্কার ও আধুনিকভাবে উপস্থাপন করা গেলে এটি শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে কেন্দ্র করে বাহুবলে হেরিটেজ ট্যুরিজমের বিকাশের সুযোগ রয়েছে।

পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বাহুবলের দর্শনীয় স্থানগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন। কামাইছড়া-মুছাই পাহাড়ি এলাকা, চা-বাগান, রাবার বাগান, আলিয়া খাসিয়াপুঞ্জি ও ফয়জাবাদ বধ্যভূমিকে যুক্ত করে পৃথক ভ্রমণ রুট তৈরি করা যেতে পারে। পর্যটকদের সুবিধার্থে নির্দিষ্ট স্থানে তথ্যকেন্দ্র, দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, নিরাপদ চলাচলের পথ, বিশ্রামাগার, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি পাহাড়ি ছড়া, বনভূমি ও হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। যত্রতত্র প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ, প্রাকৃতিক জলাধার দখল ও দূষণ প্রতিরোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। চা-বাগান, রাবার বাগান ও খাসিয়াপুঞ্জিতে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া স্থানীয় তরুণদের পর্যটন গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের বাজার সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাহুবলের পর্যটন আকর্ষণ তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে পর্যটন শুধু দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ব্যবসায়ীদের মতে, বাহুবলের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। বিশেষ করে ফয়জাবাদ বধ্যভূমি সংরক্ষণ, পাহাড়ি এলাকার নিরাপদ পর্যটন পরিবেশ তৈরি এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের প্রসার ঘটবে। সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান।

তাদের মতে, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, পর্যটন করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বাগান কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাহুবলের পর্যটন আকর্ষণ নিয়ে প্রচারপত্র, ওয়েবসাইট, মানচিত্র ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা গেলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের কাছে উপজেলাটির পরিচিতি বাড়বে।

সব মিলিয়ে বাহুবলে পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে, অভাব শুধু পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর উদ্যোগের। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি জনপদ, চা-বাগান, হাওর এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পর্যটন উপযোগী করা গেলে বাহুবল হয়ে উঠতে পারে সিলেট বিভাগের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য। এখন প্রয়োজন সম্ভাবনাকে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

কালনেত্র

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১
২৩৪৫৬৭৮
৯১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews