
স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর মানুষের বঞ্চনার কথা লিখতে লিখতে আমার কলমের নিপ যেন ভোঁতা হয়ে গেছে। তাই ভেবেছিলাম, আপাতত একটু অবসরে থাকি। কিছুদিন নীরব থাকি। চারপাশের অসংগতি, মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর স্বাস্থ্যসেবার নানা সংকট থেকে নিজেকে একটু দূরে রাখি। কিন্তু অবসর নিলেই কি মন অবসর নেয়?
মনের ভেতর প্রশ্নগুলো যখন খোঁচাখুঁচি করতে থাকে, তখন নীরব থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক তেমনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের একটি নির্দেশনার দিকে চোখ পড়তেই হঠাৎ মনে পড়ে গেল কিশোর কুমারের সেই মর্মস্পর্শী গান—
“কি আশায় বাঁধি খেলাঘর
বেদনার বালুচরে…”
সত্যিই তো—কী আশায় আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার খেলাঘর বাঁধি, যদি তার ভিত্তিই থাকে বেদনার বালুচরে?
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ওই এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বিদ্যমান বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্র্যাকটিসও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
২২ সেপ্টেম্বর জারি করা নির্দেশনাটি ১৭ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নবিষয়ক সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে বলে সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিশ্চয়ই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হাসপাতালের পাশে একের পর এক বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে ওঠা এবং সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্র্যাকটিস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের রোগীকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার জন্য দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
তাই নতুন সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হলে এর কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা, রোগীর স্বার্থ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়ানোর ক্ষেত্রে।
কিন্তু এখানেই আমার মনের মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন জন্ম নেয়।
আগে যেগুলো হয়েছে, সেগুলোর কী হবে?
একটি গাছ একদিনে বৃক্ষ হয়ে ওঠে না। বীজ থেকে চারা, চারা থেকে ডালপালা, তারপর ধীরে ধীরে বিশাল বৃক্ষ। তার শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে যায়। তাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন হয় পরিকল্পনা, অর্থ, শ্রম, সময় এবং দক্ষতার। স্বাস্থ্যখাতও তেমনই। বছরের পর বছর ধরে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কোথাও হাসপাতাল, কোথাও ক্লিনিক, কোথাও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। কোথাও সরকারি হাসপাতালের একেবারে পাশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। কোথাও হয়তো সরকারি চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখছেন।
আজ একটি পরিপত্র জারি হলো—আর কাল থেকেই সবকিছু বদলে যাবে—বাস্তবতা কি এত সহজ?
সর্প হয়ে দংশন করো, আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ো—এভাবে কি একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিচালিত হতে পারে?
এক সরকার অনুমোদন দিল, আরেক সরকার এসে বলল অনুমোদন দেওয়া যাবে না। একসময় যে ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, পরে আরেকটি নির্দেশনায় সেই ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু মাঝখানে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, সে কোথায়?
সে হলো—সাধারণ রোগী।
যে মানুষটি অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে যায়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ায়। কখনো ডাক্তার পায়, কখনো পায় না। পরীক্ষা করাতে গিয়ে অপেক্ষা করে। ওষুধের জন্য লাইনে দাঁড়ায়। আবার কখনো হাসপাতালের ভেতর থেকেই তাকে বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানে যেতে বলা হয়।
তার কাছে সরকার বদল মানে কী?
পরিপত্র বদল মানে কী?
প্রজ্ঞাপন বদল মানে কী?
সে শুধু চায়—সুস্থ হতে।
স্বাস্থ্যখাতের সংকট কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এটি বহু বছরের জমে থাকা কাঠামোগত সমস্যা। এর মধ্যে আছে জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ, চিকিৎসকের উপস্থিতি, রোগী ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি, দালালচক্র, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। তাই এর দায়ও শুধু একটি সরকার বা একটি সময়ের ওপর চাপিয়ে দিলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, যে সময়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক—স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা এবং মানুষের অধিকারই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
বর্তমান সরকার উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কিন্তু ঘোষণা থেকে বাস্তবায়নের পথটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের মানুষ বহু ঘোষণা শুনেছে। বহু পরিপত্র দেখেছে। বহু কমিটি হয়েছে। বহু তদন্ত হয়েছে। বহুবার বলা হয়েছে—‘ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
মানুষ এখন জানতে চায়—
ব্যবস্থা নেওয়া হলো কি?
এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিকের অনুমোদন বন্ধ করা হলো—ভালো কথা। কিন্তু পুরোনো অনুমোদনগুলোর কী হবে? বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে তদারকি করা হবে? যারা নিয়ম ভাঙবে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা হবে? সরকারি চিকিৎসক যদি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেন, তাহলে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে? রোগীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে কী হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন। কারণ শুধু চিঠি চালাচালি করে একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা বদলে যায় না।
চিঠি নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু হাসপাতালের করিডোরে রোগীর কান্না থামাতে পারে না। পরিপত্র জারি হতে পারে, কিন্তু দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার খরচ কমিয়ে দিতে পারে না। অফিস আদেশ হতে পারে, কিন্তু একজন অসহায় মায়ের সন্তানের জীবন ফেরাতে পারে না। তার জন্য দরকার কঠোর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।
একটি সরকারি হাসপাতালকে শুধু ভবন হিসেবে দেখলে চলবে না। সেটি একজন দরিদ্র মানুষের শেষ আশ্রয়। সেখানে একজন কৃষক আসে, একজন শ্রমিক আসে, একজন রিকশাচালক আসে, একজন নিম্নবিত্ত মা তার সন্তানকে নিয়ে আসে। তাদের কাছে সরকারি হাসপাতাল কোনো বিকল্প নয়—অনেক সময় এটাই একমাত্র ভরসা।
তাই সরকারি হাসপাতালকে শক্তিশালী করা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা।
আমরা চাই না সরকারি হাসপাতালের পাশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকবে কি থাকবে না—এই প্রশ্নই স্বাস্থ্যনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠুক। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
কেন একজন রোগী সরকারি হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না?
কেন তাকে বাইরে যেতে হচ্ছে?
কেন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক সরকারি কর্মঘণ্টায় রোগীর পাশে থাকবেন না?
কেন একজন রোগীকে ঘিরে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হবে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য?
পরিপত্র প্রয়োজন। আইন প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবারও প্রয়োজন আছে। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে প্রয়োজন মানুষের জীবন ও মর্যাদা।
স্বাস্থ্যখাতকে যদি সত্যিই বদলাতে হয়, তাহলে শুধু নতুন অনুমোদন বন্ধ করলেই হবে না; পুরোনো অনিয়মের হিসাবও দেখতে হবে। কোথায় কী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, কীভাবে দেওয়া হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে চলছে কি না—এসবের স্বচ্ছ পর্যালোচনা প্রয়োজন। কারণ অতীতকে পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না।
আজ নতুন একটি সিদ্ধান্ত এসেছে। আগামীকাল হয়তো আরেকটি পরিপত্র আসবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ চায় না শুধু কাগজে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার হোক। সে চায় হাসপাতালের দরজা দিয়ে ঢুকে সম্মান নিয়ে চিকিৎসা পেতে। সে চায় তার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে না হয়। সে চায় সরকারি হাসপাতাল তার শেষ আশ্রয় হোক—শেষ হতাশা নয়। তাই আবার সেই গানটি মনে পড়ে— “প্রতিদিনই ওঠে নতুন সূর্য, প্রতিদিনই আসে ভোর-
ওঠে না সূর্য, আসে না সকাল, জীবন আঁধারে মোর…”
আমরা চাই নতুন সূর্য উঠুক। কিন্তু সেই সূর্য যেন শুধু নতুন পরিপত্রের কাগজে না ওঠে—উঠুক হাসপাতালের বারান্দায়, রোগীর মুখে, চিকিৎসকের দায়িত্ববোধে, প্রশাসনের জবাবদিহিতে এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে।
নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে— কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে?
আর সেই প্রশ্নের উত্তর একদিন না একদিন রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট