
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। অক্টোবরে মাত্র ২৭ দিনেই প্রাণ গেছে ১৫৫ জনের। এক দিনে ১১ জনের মৃত্যু আর দুই হাজারের বেশি নতুন রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা জানিয়ে দিচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। অথচ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পূর্বাভাস ছিল, ঝুঁকিপূর্ণ সময় নিয়ে সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরাও। সরকার প্রতিরোধ অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে, সিটি করপোরেশনগুলো মশা নিয়ন্ত্রণে তৎপরতার কথা বলেছে। তারপরও যদি মৃত্যুর মিছিল থামানো না যায়, তবে প্রশ্ন উঠবেই—প্রতিরোধব্যবস্থার ঘাটতি কোথায়, আর এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২৭ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে; হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৭১ জন। তাঁদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৮৯৯ জন, খুলনায় ২৫০, চট্টগ্রামে ২৪১, রাজশাহীতে ২২৯ এবং বরিশালে ২১৭ জন। বছরের শুরু থেকে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৭। সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৪২২ জন; এখনো চিকিৎসাধীন ৬ হাজার ৪১৫ জন।
মাসভিত্তিক হিসাব আরও উদ্বেগজনক। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল পাঁচজনের। জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জন মারা যান। অক্টোবরে ২৭ দিনেই মৃত্যু ১৫৫। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০৩ জন—বছরের মোট মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, ডেঙ্গুর ভয়াবহতা কয়েক মাসের মধ্যেই বহুগুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিকে নিছক মৌসুমি রোগের প্রকোপ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।
বিপদের পূর্বাভাসও অজানা ছিল না। ৯ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সরকার তিন মাসের প্রতিরোধ অভিযান চালানোর কথাও জানিয়েছিল। তাহলে আগাম সতর্কতা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা গেল না কেন? প্রস্তুতি কি যথেষ্ট ছিল না, নাকি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে কেবল নতুন অভিযান ঘোষণায় মানুষের উদ্বেগ কমবে না।
২২ অক্টোবর বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করা, ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি। তাহলে প্রশ্ন, এসব উদ্যোগের পরিমাপযোগ্য ফল কোথায়? কতটি প্রজননস্থল ধ্বংস হয়েছে, কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব কমেছে, ব্যবহৃত ওষুধ কতটা কার্যকর—এসব তথ্য কি নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে? জবাবদিহি ছাড়া অভিযান চলতে থাকলে তা কাগজে-কলমে সাফল্য দেখানোর আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের আট বিভাগেই রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাই দায় শুধু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নয়; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবারই সমন্বিত দায়িত্ব রয়েছে। কোথাও মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, নিয়মিত নজরদারির তথ্য প্রকাশ করতে হবে এবং প্রতিরোধ কার্যক্রমে অবহেলা থাকলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। পাশাপাশি রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালের শয্যা, পরীক্ষা, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের প্রস্তুতিও নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বমি, তীব্র পেটব্যথা, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা নাগরিকেরও দায়িত্ব। কিন্তু নাগরিকের সচেতনতার কথা বলে কর্তৃপক্ষের দায় আড়াল করা যাবে না। ব্যক্তিগত সতর্কতা রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে; কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
ডেঙ্গুতে ৪০০ মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের শোক ও অপূরণীয় ক্ষতি। অক্টোবরে ১৫৫ প্রাণহানির পরও যদি প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত না হয়, ব্যর্থতার কারণ প্রকাশ না করা হয় এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে আশ্বাসের মূল্য থাকবে না। এখন দরকার লোকদেখানো তৎপরতা নয়, ফলাফলভিত্তিক কাজ; নির্বিচারে ওষুধ ছিটানো নয়, প্রজননস্থল ধ্বংস ও কার্যকারিতা যাচাই; আর দায় এড়ানো নয়, স্পষ্ট জবাবদিহি। মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের সাফল্যের হিসাব দিতে হবে কাজের মাধ্যমে—ঘোষণায় নয়।
দ.ক.২৬