
হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা ভূমি অফিস যেন ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে ঘুষ ছাড়া কোন কাজ হয় না। বাহুবল ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই প্রধান সহকারী রতন মনি পালকে না ধরলে নড়ে না কোন ফাইল। ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের মূল্য তালিকা সম্বলিত সাইনবোর্ডথাকলেও তা’ কেবল লোক দেখানো মাত্র। সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
খতিয়ান উত্তোলন, নামজারি, মিউটেশন কিংবা ভূমি পরিমাপ—প্রতিটি সেবার জন্যই অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অভিযোগ উঠেছে,ভূমি প্রধান সহকারী কর্মকর্তা কর্মকর্তা রতন মনি পাল ঘুষ ছাড়া নড়েন না।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বাহুবল উপজেলা ভূমি অফিসের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর ঘুষ বাণিজ্যের হালচিত্র। প্রধান সহকারী রতন মনি পালের কাছে কোন কাজই অসাধ্য নয়। বৈধ কাগজপত্র থাকা স্বত্বেও ঘুষের রেটে হেরফের হলে প্রকৃত ভূমি মালিকদের হতে হয় চরম হয়রানির শিকার। জমির নামজারি কেস জমা দিতে লাগে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। নামজারি করতে সরকার- নির্ধারিত ফি যেখানে ১ হাজার ১৫০ টাকা। সেখানে ভুক্তভোগীদের গুনতে হয় হাজারো টাকা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে পরিচয় গোপন রেখে গ্রাহক সেজে ভূমি অফিসের প্রধান সহকারী রতন মনি পালের কাছে নামজারি করার কথা বলতে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, কাগজপত্র সঠিক থাকলে ‘খাজনাসহ ৮,০০০/= টাকায় নামজারি পর্চা করে দিতে পারবেন। খাজনা পরিশোধ রয়েছে এমন কথা জানালে তিনি বলেন তা’ হলে ৫,০০০/= টাকা লাগবে। তিনি আরো বলেন, কাগজপত্র ঠিক না থাকলে অফিসকেই দিতে হবে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। সে কারনে কাগজপত্র ঠিক না থাকা নামজারি কেস ১২ হাজার টাকার নিচে হাতে নেয় না বলে জনায় ওই প্রধান সহকারী রতন মনি পাল । কিছু দালাল-কর্মচারী সবাই মিলে উপজেলা ভূমি অফিসে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। ফলে প্রধান সহকারী রতন মনি পাল ও অপূর্ব নামে দুই কর্মচারী উৎপাতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। দালাল-কর্মচারীর নেই কোন লুকো লু চুরি, লাখ-লজ্জা ও ভয়ভীতি। এমনভাবে ঘুষের দরদাম চলে, এ যেন বাজারের গরু ছাগলের বেচা- কেনা চলছে। দাবিমত টাকা দিলে ভূমি সংক্রান্ত সকল কাজ হয় নিমেষেই। অনিয়মের বেড়াজালে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। নামজারি শুনানীর দিনে নির্ধারিত লোকের অনুপস্থিতিতে প্রধান সহকারী রতন মনি পাল ও অপূর্ব করে দেয় খারিজসহ সব ধরনের কাজ। এই অফিসের দূর্নীতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত পরিচিত হয়ে থাকে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভূক্তভোগীরা। দলিলপত্র ঠিক থাকলে টাকার পরিমাণ কম রাখা হয়। একটু এদিক-সেদিক হলে আর রক্ষা নেই, হাজার হাজার টাকা ঢেলেও নিস্তার মেলে না। এমনকি ‘র’ এর কাছে ‘ব’ মানে নিচে বিন্দু না পড়লে টাকার অংক বেড়ে যায় কয়েক হাজার।
সূত্রমতে জানা যায়, বাহুবল উপজেলা ভূমি অফিসসহ ৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রায়ই কর্মচারীরা দালালিতে সক্রিয় রয়েছে। তাদের হাত দিয়েই নামজারি কেস একসাথে জমা করে প্যাকেজ হিসেবে জমির মালিক ছাড়াই জমা দেয় খারিজ করার জন্য। এই সব অসাধু কর্মচারীরা নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে উপজেলা ভূমি অফিসসহ সকল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কাজকর্ম। যারা টাকার বিনিময়ে নামজারী আবেদন করে তাদের নামজারি কেসের রিপোর্ট হয়ে যায় কোন বাঁধা ছাড়া।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জন ভূক্তভোগী বলেন, ভূমি অফিসের দেয়ালও যেন ঘুষ চাই। এই অফিসের কর্মচারীরা দিনে কত টাকা যে ঘুষ নেয় তা একমাত্র আল্লাহ্-ই জানেন। ভূমি অফিসের ঘুষ দুর্নীতির বিষয় সকলেরই জানা, তারপরও কোন প্রতিকার নেই। প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের এমন দৃশ্য দেখলে মনে হবে এ যেন সর্ষের মধ্যে ভূত। অফিসের সিসি ক্যামেরাগুলো সুবিধাজনকভাবে বসানো থাকে। কয়েকটি কক্ষে অকেজো করে অথবা ক্যামেরার মূখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখা হয় যাতে ঘুষ লেন-দেনের কোন ডকুমেন্ট ক্যামেরায় না আসে। প্রধান সহকারী রতন মনি পাল ও অপূর্ব নামে দুই কর্মচারী প্রতি ইউনিয়ন থেকে দৈনিক ১০ টি নামজারি করলেও ৭ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দৈনিক ৭০ টি নামজারি খারিজ করা হয়। তাহলে প্রতি নামজারি থেকে ২ হাজার টাকা নিলেও দৈনিক ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা আয় করে তারা। এইসব দেখার যেন কেউ নেই। ফলে তারা গড়ে তুলেছেন নামে বেনামে অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
সরেজমিনে বাহুবল ভুমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, নামজারি কেস জমা নেওয়ার সময় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে ঘুষ নিচ্ছে অফিস সহায়ক অপূর্ব এবং প্যাকেজ খারিজ করে দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে টাকা ঘুষ নিচ্ছে প্রধান সহকারী রতন মনি পাল। তাদের দুই’জনকে কিসের টাকা নেওয়া হচ্ছে? এমন প্রশ্নে কোন উত্তর দিতে পারেননি তারা।
সচেতন মানুষরা বলছেন, নিয়মিত মনিটরিং ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় দিন দিন এমন অনিয়ম বেড়েই চলেছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, কেবল আশ্বাস নয়, কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। উপজেলা ভূমি অফিসকে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর জন্য প্রশাসনের উচিত দ্রুত অভিযান চালিয়ে দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনা।
এব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সায়ীদ মুহাম্মদ এর কাছে জানতে চাইলে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দ.ক.সিআর