
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা কেবল সহায়ক শক্তির ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতার লড়াইয়ের এক মৌলিক ও রূপান্তরমূলক স্তম্ভ।
সশস্ত্র রণাঙ্গন থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ক্ষেত্র হাসপাতাল, সংকেত আদান-প্রদান কিংবা রাজনৈতিক সংগঠন—প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি ছিল অসীম সাহসিকতার সাক্ষ্য। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁদের অনেকের দীর্ঘশ্বাস ও আত্মত্যাগের কাহিনী অন্তরালেই থেকে গেছে। এই অগণিত বীরগাথার মধ্য থেকে স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল এক নাম ডা. লায়লা পারভীন বানু। পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের ক্ষতকে যিনি ব্যক্তিগত শোকে আটকে না রেখে রূপান্তর করেছিলেন প্রতিরোধ্য এক জাতীয় শক্তিতে।
কুষ্টিয়ার এক ঐতিহ্যবাহী ও প্রগতিশীল পরিবারে ১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন লায়লা পারভীন বানু। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা (পরিদর্শক) শহীদ আজিজুর রহমান এবং মা আনোয়ারা রহমান—উভয়ের উৎসাহে ও মূল্যবোধে তিনি গড়ে ওঠেন। ১৯৬৭ সালে ভর্তি হন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। কিন্তু ১৯৭১ সালের কালরাত তাঁর জীবন ও স্বপ্নের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়।
২৫ মার্চের কালরাতের পর রাজশাহী শহর প্রায় ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত মুক্তিকামী স্বাধীনতাকামীদের অধীনে ছিল। কিন্তু ১৪ এপ্রিল সকালে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা চালিয়ে রাজবাড়ী-রাজশাহী অঞ্চলে চড়াও হয় এবং পরিদর্শক আজিজুর রহমানসহ অন্য কর্মকর্তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে। নিথর দেহগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকলেও আতঙ্কে কেউ দাফনে এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। নিজ হাতে পিতার মরদেহ দাফনের সেই নারকীয় অভিজ্ঞতা তরুণী লায়লার মনে এক গভীর ও চিরস্থায়ী রূপান্তর ঘটায়। শোকের বিহ্বলতা মুহূর্তেই পরিণত হয় অনমনীয় রাজনৈতিক চেতনায় ও প্রতিরোধের ব্রতে।
জুন মাসের গোড়ার দিকে তিনি পা বাড়ান কলকাতার ঐতিহাসিক ‘গোবরা ক্যাম্পের’ দিকে। প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অনুমোদনে মুক্তিযুদ্ধে নারী সংগঠক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভারত সরকার শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে নারীদের সরাসরি সমরাস্ত্র ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ না করলেও, ক্যাম্পে প্রায় ৩০০ তরুণী ও কিশোরীকে সিভিল ডিফেন্স, গোলন্দাজ ও গেরিলা চালনার কৌশল, নার্সিং এবং প্রথম চিকিৎসার নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে ডা. লায়লা পারভীন বানু কেবল প্রাথমিক চিকিৎসায় সীমিত থাকেননি; শরণার্থী শিবিরে আহত ও নির্যাতিত নারীদের সেবাদানে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেন।
এরই মাঝে ২ মে গ্রামে হামলা চালিয়ে হানাদার বাহিনী তাঁদের পৈতৃক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফিরে এসে ঝুলন্ত অবস্থায় দাদার মরদেহ দেখার পর তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি ও শোকের তীব্রতা আরও গভীর হয়। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁকে আদর্শচ্যূত করতে পারেনি। নিজের স্মৃতিচারণে তিনি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন, ধর্মদাহ সীমান্ত ও মাথাভাঙ্গা নদীর তীরে ভিড় করা আহত ও নির্যাতিত মানুষদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করাই ছিল তাঁর সেই মুহূর্তের সর্বোচ্চ দায়িত্ব।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মেডিকেল পড়াশোনা শেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজেই প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসাসেবার বহুমাত্রিক প্রসারে সাভারের ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’-এর সাথে যুক্ত হন, যেখানে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। গণস্বার্থ রক্ষা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর এই পদচারণা অব্যাহত থাকে; যা পরবর্তীতে তাঁকে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিভাগীয় প্রধানের মতো গুরুদায়িত্বে উপনীত করে।
একাত্তরের রণাঙ্গনে যে মেয়েটি বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধে নেমেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি অরাজকতামুক্ত ও প্রগতিশীল শিক্ষার পরিবেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করে গেছেন।
ডা. লায়লা পারভীন বানুর এই জীবন পরিক্রমা কেবল এক ব্যক্তির সংগ্রামের গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও দেশগঠনে নারীর ঐতিহাসিক ও অপরিহার্য ভূমিকার এক প্রতীকী দলিল।
দ.ক.সিআর.২৬