
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার নূরপুর ইউনিয়নের সন্তান যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (COP31)-এ অংশ নিতে যাচ্ছেন। সিলেট বিভাগের প্রথম তরুণ প্রতিনিধি হিসেবে তিনি তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এই আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে তিনি Young Climate Action Network (YOUCAN)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এবং তরুণ জলবায়ুকর্মী হিসেবে অংশ নেবেন।
একই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বনেতাদের শীর্ষ সম্মেলনেও (World Leaders’ Summit) তাঁর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস বর্তমানে উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাব, হবিগঞ্জের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি সংগঠনটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯ সাল থেকে সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নেতৃত্ব বিকাশ ও সামাজিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি।
যুধিষ্ঠিরের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাব, হবিগঞ্জের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংগঠনটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, দল পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
এ প্রসঙ্গে যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমি আমার লিডারশিপ স্কিল ডেভেলপ করেছি উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাব, হবিগঞ্জ থেকে। এই সংগঠনের মাধ্যমেই আমি নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করেছি এবং আজকের অবস্থানে আসার আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। বিশেষ করে উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মোহাম্মদ মোশাহিদ মজুমদারের অবদান স্বীকার না করলেই নয়। তাঁর দিকনির্দেশনা, পরামর্শ ও সহযোগিতা না পেলে আজকের এই পর্যায়ে আসা আমার জন্য অনেক কঠিন হতো। তাঁর প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মোহাম্মদ মোশাহিদ মজুমদার বলেন, “যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস আমাদের সংগঠনের শুরুর দিক থেকেই যুক্ত। একজন তরুণ সংগঠক হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠা, বিভিন্ন দায়িত্ব পালন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথচলা আমাদের জন্য আনন্দের ও গর্বের। শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল, উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাব শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তরুণদের নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দক্ষতা বিকাশের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে উঠবে।
যুধিষ্ঠিরের এই অগ্রযাত্রা আমাদের সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। আমরা বিশ্বাস করি, স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক পরিবেশ, সুযোগ, দিকনির্দেশনা ও কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে আমাদের তরুণরাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর এই অর্জন হবিগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের অন্যান্য তরুণকে অনুপ্রাণিত করবে। আমরা তাঁর উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।”
যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস জাতিসংঘের বাংলাদেশ যুব উপদেষ্টা গ্রুপের (UN Youth Advisory Group) দুই মেয়াদে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি Mock COP Bangladesh-এর ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট এবং Commonwealth Youth Climate Change Network-এর মেম্বারশিপ লিড হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘ বাংলাদেশের Youth as Researchers (YAR) কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন।
জলবায়ু ও যুব উন্নয়নবিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি দেশি-বিদেশি নীতিনির্ধারক, জাতিসংঘের কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছেন। এ সময়ে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং কমনওয়েলথের মহাসচিব শার্লি বচওয়েরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচি ও আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
২০২৬ সালের ৮ থেকে ১০ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের পানি সম্মেলনের Youth Organising Committee-তে নির্বাচিত হয়েছে যুধিষ্ঠিরের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন YOUCAN। পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ষষ্ঠ লক্ষ্য (SDG 6) বাস্তবায়নসংক্রান্ত কার্যক্রমে সংগঠনটির সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের পানি ও জলবায়ুবিষয়ক আন্তর্জাতিক আলোচনা এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করছে সংগঠনটি।
যুধিষ্ঠিরের COP31-এ অংশগ্রহণের অন্যতম লক্ষ্য বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর বাস্তবতা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলের আগাম বন্যা, ফসলহানি, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবন-জীবিকায় সৃষ্ট সংকট নিয়ে তিনি আলোচনা করতে চান।
যুধিষ্ঠির বলেন, “বাংলাদেশ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বহনকারী একটি দেশ নয়; বৈশ্বিক জলবায়ু সমাধান ও নীতিনির্ধারণেও আমাদের সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। হাওর, নদী, উপকূল ও জলাভূমির মানুষের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাকে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করাই আমার অংশগ্রহণের অন্যতম লক্ষ্য।”
তিনি আরও বলেন, “সিলেটসহ বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। আগাম বন্যা, ফসলহানি, পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়; এগুলো জলবায়ু ন্যায্যতারও প্রশ্ন। আমি চাই, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় হাওরাঞ্চলের মানুষের বাস্তবতা ও প্রত্যাশা যথাযথভাবে উঠে আসুক।”
COP31-এ জলবায়ু অভিযোজন, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা, ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে তরুণদের অবস্থান তুলে ধরার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
নূরপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাস্তবতা থেকে শুরু হওয়া যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাসের জলবায়ুবিষয়ক কার্যক্রম আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর এই অগ্রযাত্রায় উদ্ভাবনী বিজ্ঞান ক্লাব, হবিগঞ্জের সাংগঠনিক ও নেতৃত্ব বিকাশমূলক কার্যক্রমের ভূমিকা রয়েছে। একজন তরুণ সংগঠক থেকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অঙ্গনে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠার এই পথচলা স্থানীয় পর্যায়ে তরুণ নেতৃত্ব তৈরির সম্ভাবনাকেও তুলে ধরে।
হবিগঞ্জের একজন তরুণ হিসেবে COP31-এ অংশ নিয়ে হাওরাঞ্চলের মানুষের কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার প্রত্যাশা করছেন যুধিষ্ঠির। তাঁর এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে হবিগঞ্জ তথা সিলেট বিভাগের তরুণদের আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনা ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কালনেত্র