শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:০৪ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
হবিগঞ্জে ঘাস কাটতে গিয়ে সাপের কামড়ে কৃষকের মৃত্যু স্কুলে গাছের ডাল লাগিয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন: অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের বিরোদ্ধে নকলের ভীড়ে আসল উধাও! কলঙ্কিত বাহুবলের সাংবাদিকতা- সাজিদুর রহমান চুনারুঘাটে মানিক ভান্ডার গ্রামে হামলা, ভাংচুর ও শ্লীলতাহানি: থানায় মামলা  ​মব জাস্টিস বনাম আইনের শাসন: মাদকের সমাধান কোন পথে? সীমান্তের শীর্ষ গরু চোরাকারবারি তাহের, বাবরুর গনিষ্ট সহচর চুনারুঘাটে আশরাফ ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের উদ্যোগে হজ ও ওমরা বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত আজমিরীগঞ্জে মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ২ জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে এহছানে এলাহী’র দোয়া ও ভোট প্রার্থনা শায়েস্তাগঞ্জে মাদকসহ আটক ২: মোবাইল কোর্টে এক বছরের কারাদণ্ড

​মব জাস্টিস বনাম আইনের শাসন: মাদকের সমাধান কোন পথে?

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

মোঃ আবদুর রকিব আনু: ​মাদক একটি সমাজ বিধ্বংসী ব্যাধি এবং এর করাল গ্রাস থেকে তরুণ প্রজন্ম ও সমাজকে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য—এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু অতিসম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদকসেবী ও মাদক কারবারিদের ধরে সাধারণ মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং তাদের ওপর বর্বর কায়দায় শারীরিক নির্যাতন চালানোর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাদক নির্মূলের নামে এই ধরণের ‘মব জাস্টিস’ বা গণ-আদালত বসানোর প্রবণতা কোনো সুস্থ ও সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

​প্রথমত, আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন, তাকে শাস্তি দেওয়ার একমাত্র এখতিয়ার রাষ্ট্রের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার। দেশের প্রচলিত আইনকে তোয়াক্কা না করে যখন একদল উন্মত্ত জনতা নিজেই বিচারক এবং জল্লাদের ভূমিকা পালন করে, তখন সমাজের আইনগত কাঠামোটি ভেঙে পড়ে। মাদক সেবন বা কারবার নিশ্চিতভাবেই অপরাধ, কিন্তু তার শাস্তি দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। মব জাস্টিসের মাধ্যমে কোনো অপরাধের সমাধান তো হয়ই না, বরং এটি সমাজে নতুন এক অপরাধ ও নৈরাজ্যের জন্ম দেয়।

​দ্বিতীয়ত, এই ধরণের প্রকাশ্য নির্যাতন এবং তা সামাজিক মাধ্যমে মহাসমারোহে প্রচার করার সংস্কৃতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। বিশ্বমঞ্চে এটি এমন এক বার্তা পাঠাচ্ছে যেন দেশে আইনের কোনো শাসন নেই এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের যে মর্যাদা, তা এই ধরণের মধ্যযুগীয় আচরণের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

​তৃতীয়ত, গণপিটুনি বা তাৎক্ষণিক বিচারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নিরপরাধ মানুষের বলির পাঁঠা হওয়া। অতীতে আমরা দেখেছি, ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে প্রতিপক্ষকে ‘মাদকসেবী’ বা ‘মাদক কারবারি’ অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি যদি আজ আমরা প্রতিহত না করি, তবে কাল যে কোনো সাধারণ নাগরিক এই অন্ধ আক্রোশের শিকার হতে পারেন।

​আমরা যদি সত্যিই একটি মাদকমুক্ত সমাজ চাই, তবে আমাদের আবেগ তাড়িত না হয়ে আইনি ও কাঠামোগত পথে হাঁটতে হবে। এ লক্ষ্যে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি:

​১. আইন ও বিচার ব্যবস্থার দ্রুত কার্যকারিতা: মাদকের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের বিচার যেন দীর্ঘসূত্রিতার কবলে না পড়ে, সে জন্য বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্য শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যখন মানুষ দেখবে অপরাধী আইনের ফাঁক গলে পার পাচ্ছে না, তখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এমনিতেই কমে আসবে।

​২. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান: যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে এবং ভিডিও ছড়িয়ে সমাজকে অস্থিতিশীল করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। ‘মব জাস্টিস’ পরিচালনাকারীদের ছাড় দেওয়া যাবে না।

​৩. আসক্তিকে ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা: মাদকসেবীদের কেবল অপরাধী হিসেবে না দেখে তাদের চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। মাদকসেবীদের পিটিয়ে নয়, বরং মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে পুনর্বাসন করতে হবে।

​৪. মূল উৎপাটন: খুচরা মাদকসেবী বা সাধারণ বাহকদের ওপর ক্ষোভ না ঝেড়ে মাদক চোরাচালানের মূল গডফাদার এবং সিন্ডিকেটগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

​একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নৈরাজ্য কখনো প্রতিষেধক হতে পারে না। মাদক নির্মূলে আমাদের সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার মাধ্যমে, নিজেরা ঘাতক বা বিচারক সেজে নয়।

আমরা মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই—তবে তা হতে হবে আদালতের এজলাসে, রাজপথে পিটিয়ে নয়। সরকার, প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে দেশে আইনের শাসন সমুন্নত রেখে একটি মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণ করতে।

দ.ক.সিআর.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized By BreakingNews