
হাবিব খোকন: প্রসঙ্গ হবিগঞ্জের চলমান সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। কথাগুলো অনেকের অপছন্দ হতে পারে। তবে একজন নগণ্য সংস্কৃতিকর্মীর সংস্কৃতি যে শিক্ষা পেয়েছি “সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলা” সেটাই লেখার চেষ্টা করছি।
তোষামোদি করিয়া নাম ধরিয়া ধরিয়া তালিকা সাজাইয়া অভিনন্দন জানানোর মনভাবনা আমার স্বীয়মনে আসিতেছে না, তাই ইহার জন্য আমি চলমান তোষামোদি রীতিতে গাঁ ভাসাইতে পারিলাম না বলে, আমি ভারাক্রান্ত মনে দুঃখিত হইলাম। তয় যোগ্যতার ভিত্তিতে যাহারা সম্মানিত হইয়াছেন তাহাদিগের চরণযুগলে আমার ভক্তি রহিল। প্রকাশিত সম্মাননার তালিকায় আমার চক্ষুযুগল বুলাইয়া দেখিলাম সম্মানিত লোকদের সম্মানিত করিয়া কিভাবে তাদের সম্মানে পদাঘাত করা হইয়াছে। এইবার যেহেতু আলোচনার অভ্যন্তরে চলিয়া আসিয়াছি, ইহার জন্য চলিত রীতিতে ফিরিয়া যাই।
আমরা যখন হবিগঞ্জের বাহিরে ঢাকাতে পরিবেশনা করতে যাই কিছু কিছু কাজ চমৎকার হয় আবার কিছু কিছু কাজ নিম্নমানের হয়, তো ঢাকার মানুষজন বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যারা তারা তো আন্ডারইস্টিমেট করে কিছু বলতে পারে না, সো তারা সুন্দর করে বলে “বাহ তোমরা তো নিজেও জানো না তোমরা কি চমৎকার পরিবেশনা যে করেছো”, যদিও এটি প্রশংসা তবে প্রশংসার আড়ালে যেই মুলা দিসে এইটাকে বর্তমান সময়ের যথাযথ শব্দে বলতে গেলে বলতে হয় “বরাক বাঁশ”। সাহিত্যরীতি শব্দ চয়নটি সমীচীন নয় বলে পাঠকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
আসুন পয়েন্টে আসি, এমন কিছু মানুষের নাম দেখলাম যারা জেলা পর্যায়ে সম্মাননায় আবদ্ধ নন, ইতিমধ্যে জাতীয় পর্যায়ের সমমানের সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন স্ব স্ব মর্যাদায়। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের “সেরা ছাত্র” পুরস্কার দেওয়া হয়, তাহলে সেটি কি সম্মান, নাকি বিব্রতকর সৌজন্য?
জানি না সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তাদের নিজের সম্পর্কে কতটুকু অবগত। আমার মনে হয় না অবগত আছেন! ধরুন আমি শিশু সাহিত্য নিয়ে লেখালেখি করি এখন আমাকে যদি অনুবাদ সাহিত্যে সম্মাননা দেওয়া হয় সেটা কি আমাকে এবং আমার কর্মকে অসম্মানিত করা নয়? কারণ অনুবাদ নিয়ে তো আমার একপাতা লেখাও নেই, সেটা আমি যেমন জানি আপনারাও জানেন। ঠিক আসলেই তাই আমরা জানি আপনাদের সম্পর্কে কারণ আপনাদের হাতে আমরা লালিত। সম্মানিত গুরুজনেরা দয়া করে আমার লেখাটা পড়ো নারাজ হবেন না, এক অংশ আপনাদের সম্মানিত করতে গিয়ে আড়ালে আপনাদের সম্মানহানি করছে। প্রশ্নটা যদি এমন হয়! সম্মাননা কি ব্যক্তিকে দেওয়া হচ্ছে, নাকি তাঁর কাজকে? যদি কাজকে দেওয়া হয়, তাহলে কাজের সঙ্গে সম্মাননার মিল কোথায়?
সম্মানিত গুরুজনদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি এই প্রশ্ন আপনাদের বিরুদ্ধে নয়। বরং যারা আপনাদের নাম ব্যবহার করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রশ্নটা তাদের জন্য। কারণ আজকে সামনে সবাই অভিনন্দন জানাবে, কিন্তু আড়ালে অনেকেই বলবে “তাইন কিতা, না কোনো অ্যালবামে গান গাইছইন, না কোনো নাটক বা রেডিওতে তাইনরে দিছইন সংগীতের সম্মাননা, ক্ষমতা থাকলে সব হয় জানি না তো ইত্যাদি”। আবার ক্ষমা চাচ্ছি আপনাদের সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলেছি।
তারপর আসুন নবীন, উদীয়মান ও গুণীজন শব্দগুলোর ভার আছে, আলাদা আলাদা ক্ষেত্র আছে। উদীয়মানদের গুণীজন বলে চালিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু সেটা সবাই মেনে নেবে না। কেউ কেউ আবার মেনে নেবেন, বলবেন “যে সুদ খায় সে সুদী, আর যার গুণ আছে সে গুণী”। তাদের কাছে সত্যিই আমি অক্ষম। তাদের জ্ঞানের কাছে আমার জ্ঞান সত্যিই অতি তুচ্ছ। মনে রাখবেন যে গাছটি আজ রোপণ করা হলো, তাকে আগামীকাল বটগাছ ঘোষণা করলে গাছটিরও লাভ নেই, ঘোষণাটিরও মর্যাদা থাকে না।
নোটিশ অনুযায়ী ১২টি ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেওয়া কথা ৫ বছরে। দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো “আবৃত্তি, লোকসংস্কৃতি, আঞ্চলিক সৃজনশীল সংগঠক” মতো তিনটি শক্তিশালী ক্যাটাগরির জায়গা হলো না পাঁচ বছরের মাঝে। তাহলে ধরেই নেওয়া যায় যে, হবিগঞ্জে লোকসংস্কৃতি, আঞ্চলিক সৃজনশীল সংগঠক ও আবৃত্তিতে অবদান রাখার মতো কোনো সংস্কৃতিকর্মী নেই!
বাস্তবতা আসলে এমন আপনি মানেন আর না মানেন। এখন আমার কল্পনার কথা বলছি, একদা রাত্রিকালে সংস্কৃতির কথা ভাবিতে ভাবিতে ঘুমিয়ে পড়লাম, তারপর স্বপ্নে দেখলাম ফেসবুক চালাচ্ছি, একটা লেখা আসলো। জনৈক শিল্পী সংস্কৃতির আমলাতন্ত্র ও অনিয়ম নিয়ে নানিয়ে বানিয়ে লিখেছেন। লেখাটি তীব্র বেগে ছড়িয়ে গেল। তখন জনৈক ব্যক্তির লেখায় সংশ্লিষ্ট বাবুদের গায়ে জ্বলা শুরু হলো। বাবুরা তাদের জ্বালা নিবারণ করার জন্য সুপার সফটে বসে মিটমাট করলেন। এই নাও জাতির সম্পদ, সম্মানিত শিল্পী, নবরত্ন তৈল, মাথায় দেন ঠান্ডা মাথায় ঘুমান। তখন জনৈক ব্যক্তি ঘুমিয়ে গেলেন, সাথে সাথে উনার লেখাটি তখন আর পাওয়া যায়নি। বাবুসাবরাও জ্বালা থেকে মুক্তি পেলেন। গ্রামীণ ভাষায় বলে “কুত্তার মুখে হাড্ডি পড়লে ঘেউ ঘেউ বন্ধ”। কল্পনা আমার এখানেই থেমে নেই, কারণ কল্পনার তো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কল্পনায় অবলোকন করলাম আরো একটি মজার বিষয়। ক্ষমতার পরিবর্তন করার সাথে সাথে জনৈক ব্যক্তিদের চরিত্র কিভাবে পরিবর্তন হয় তা খেয়াল করলাম ফেসবুকের মেমরি থেকে “একদা জন্মদিন উৎসবে তখনকার ক্ষমতাসীন দলের কর্ণধার ও তখনকার ক্ষমতাপন্থী সাংস্কৃতিক নেতাকর্মী আর এখন বর্তমান ও বর্তমান ক্ষমতাপন্থী সাংস্কৃতিক নেতাকর্মীদের সাথে চেয়ারে বসা।”
তখন আমাদের রত্ন যিনি সম্মাননার ঊর্ধ্বে প্রয়াত কবি পার্থ সারথি চৌধুরীর “বসন্ত বৈশাখ” কাব্যগ্রন্থের “নিজস্ব সংবাদদাতা তার” কবিতার লাইনটি মনে পড়ে “বিবেক কি এখনো মরা ঘাস”।
ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদপত্রে সমালোচিত “নজরুল বর্ষ”। ৬ অঙ্ক বিশিষ্ট বাজেটে সাউন্ড কোয়ালিটি নিম্নমানের, প্রতিযোগিতার বিচারক নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ, নজরুল বর্ষে নজরুল সংগীতের বিপরীতে সিনেমার ও বাউল গান। বাচ্চাদের দিয়ে বড়দের গান গাওয়া হচ্ছে। এগুলো আসলে সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নাকি প্রশ্নবিদ্ধ করতে? জানার ইচ্ছা রয়েই গেল!
তবে যত কিছু বলি বা লিখি না কেনো এগুলো চলমান বহুকাল ধরে আমলাতন্ত্র আর ক্ষমতার কষাঘাতে সংস্কৃতি নিজস্বতা হারাচ্ছে, কিন্তু বিবেক মেনে নিতে পারছে না। আবার কবি পার্থ সারথির কথাটি ব্যক্ত করতে হয়
“তোমাকে তখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন রেখে ইতিহাসের অবলুপ্ত ছেঁড়াপাতা হাতে নিয়ে কানাকানি খুঁজে খুঁজে মাতাল বিষাক্ত হাওয়ায় পালিয়ে যাচ্ছি আমি
কিংবা আমাদের সম্মিলিত বিবেকের মরে যাওয়া লাশটা। তখন দূরে কেউ বাঁশি বাজায়নি, দেয়নি কোনো নির্মল সংকেত। তুমিতো পৃথিবীর সেই চির পরিচিত ছবি”
সবশেষে একটি কথাই বলতে চাই, সম্মাননা তখনই সম্মানিত হয়, যখন সেটি যোগ্যতার হাতে পৌঁছায়। অন্যথায় সম্মাননা নয়, প্রশ্নবিদ্ধ হয় প্রতিষ্ঠান; আর সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হন সেই প্রকৃত গুণী মানুষগুলো, যাঁদের নাম ব্যবহার করে অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
আমার এই লেখা কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবিশেষকে হেয় করার জন্য নয়; বরং একটি প্রক্রিয়া, একটি সিদ্ধান্ত এবং একটি সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়াস। ভুল হলে সংশোধন করব, কিন্তু প্রশ্ন তোলার অধিকার থেকে সরে দাঁড়াব না।
কারণ, সংস্কৃতি আমাকে এখনো একটি কথাই শিখিয়েছে “সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে হয়”।
লেখক: সাহিত্যিক ও নাট্যকর্মী
দ.ক/এইচ.কে