
অজয় বিশ্বাস: বাংলাদেশে বিরাজমান শুধু রাজনৈতিক সংকট বা শুধু অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত আস্থার সংকট। জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা, বিনিয়োগকারীর বাজারের প্রতি আস্থা, আমানততকারীদের ব্যাংকের প্রতি আস্থা এবং রাজনৈতিক দলের একে অপরের প্রতি আস্থা- সবগুলো বর্তমানে একসঙ্গে দূর্বল হয়ে পড়েছে। এর কারণ সকলের জানা।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যংকিং খাতের সংস্কার, সুশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু শুধু আইন পরিবর্তন বা নির্বাচন করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি ‘জাতীয় আস্থা পুনর্গঠন কর্মসূচি’। তাই এখানে বর্তমান সংকট সমাধানের প্রয়োজনে জাতীয় পর্যায়ে ১২টি পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরা হলো-
১. জাতীয় আস্থা কমিশন: প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দল, বিচার বিভাগ, ব্যবসায়ী সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ‘জাতীয় আস্থা কমিশন’গঠন করা যেতে পারে। এর কাজ হবে সরকারের সমালোচনা নয়, বরং প্রতি তিন মাসে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার সুচক প্রকাশ করা।
২. রাষ্ট্রীয় ব্যয় শৃঙ্খলা আইন: প্রতি অর্থবছরে সব মন্ত্রণালয়কে কমপক্ষে ১০% প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে হবে। নতুন কোনো গাড়ি নয়, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর নয়, বিলাসী সরকারি অনুষ্ঠান নয়, সরকারি ক্রয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল টেন্ডার, সরকার জনগণকে আগে দেখাবে যে সাশ্রয় শুরু হয়েছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই।
৩. ব্যাংকিং খাতের সামাজিক চুক্তি: ব্যাংক শুধু শেয়াহোল্ডারের নয়, আমানতকারীরও প্রতিষ্ঠান। তাই বড় ঋণখেলাপির সম্পদের প্রকাশ্য তালিকা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালক নিয়োগ, ব্যাংকের পরিচালকদের সম্পদ ঘোষণা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীসতা বিষয়ক আইন প্রণয়ণ। কারণ ব্যাংকিংখাতের সুশাসন ও স্বাধীতার প্রয়োজনীয়তার ওপর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশেষ জোর দিচ্ছে।
৪. রাজনীতির অর্থায়নে স্বচ্ছতা: বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক সংকটের পেছনে অস্বচ্ছ অর্থায়ন একটি বড় কারণ। তাই ৫ লাখ টাকার বেশি রাজনৈতিক অনুদান প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত, দলের বার্ষিক নিরীক্ষিত হিসাব অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণখেলাপি ব্যক্তি দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে পারবেন না।
৫. জাতীয় উৎপাদন চুক্তি: সব রাজনৈতিক দল পাঁচ বছর মেয়াদি একটি অর্থনৈতিক ন্যুনতম কর্মসুচিতে একমত হবে। যে সরকাই ক্ষমতায় আসুক রপ্তানি নীতি, বিদ্যুৎ নীতি, কৃষি নীতি ও শিক্ষা নীতি হঠাৎ পরিবর্তন করা যাবে না। এরফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
৬. জেলা অর্থনীতি মডেল: ঢাকা কেন্দ্রিক উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি জেলার জন্য তিনটি প্রধান শিল্প নির্ধারণ করতে হবে। যেমন- খুলনা: জাহাজ নির্মাণ, মৎস্য ও তথ্য প্রযুক্তি। রাজশাহী: আম ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প। সিলেট: পর্যটন ও চা। এতে অভ্যন্তরীণ বৈষম্য কমবে।
৭. দুর্নীতি প্রতিরোধে উন্মুক্ত অর্থনীতি: প্রতিটি সরকারি প্রকল্পে- ব্যয়, ঠিকাদারের নাম, কাজের অগ্রগতি, ছবি, অর্থ ছাড়, সব তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। গোপনীয়তা কমলেই দুর্নীতি কমবে।
৮. জাতীয় সঞ্চয় পুনর্জাগরণ: ভোগের পরিবর্তে সঞ্চয়কে উৎসাহ দিতে হবে। সঞ্চয়পত্র, পেনশন, দীর্ঘমেয়াদি আমানত ও উৎপাদানমুখী বিনিয়োগে কর সুবিধা দেওয়া।
৯. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইর্ন্টাশিপ চালু করা যেতে পারে। এরফলে শিক্ষিত বেকারত্ব কমবে।
১০. রাজনৈতিক সহনশীলতা সনদ: সরকার ও বিরোধী দল লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দেবে- রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, শাান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করা, নির্বাচনের পর প্রতিশোধমূলক তৎপরতা বন্ধ ও প্রশাসনিক পরিবর্তন সীমিত রাখা।
১১. জাতীয় মূল্যস্ফীতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র: প্রতিদিন চাল, ডাল, তেল, চিনি, গ্যাস ও বিদুতের তথ্য প্রকাশ করা হবে। স্বচ্ছ তথ্য বাজারে গুজব কমাবে এবং সিন্ডিকেটের সুযোগ সংকুচিত হবে।
১২. ১০০ দিনের জনবিশ্বাস কর্মসুচি: ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১০০ দিনে সরকারকে অন্তত ৫টি দৃশ্যমান কাজ করতে হবে- ক. বড় ঋণ খেলাপির তালিকা প্রকাশ, খ. সরকারি ব্যয় ১০% কমানো, গ. সব বড় প্রকল্পের তথ্য উন্মুক্ত করা, ঘ. রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করা ও ঙ. জেলা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু জনসংখ্যা নয়, জনগণের বিশ্বাস। যখন মানুষ বিশ্বাস করে রাষ্ট্র ন্যায়সংগত, ব্যাংক নিরাপদ, করের টাকা অপচয় হয় না এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন মানেই প্রতিশো নয়- তখন বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই বারোটি রূপরেখার মূল দর্শন হলো- ‘ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নীতির ধরাবাহিকতা; আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা।’
এই ধারণাটি রাজনৈতিক সমঝোতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, সুশাসন ও আস্থা পুনর্গঠনকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে একটি সমন্বিত নীতি-রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করে।
দ.ক.সিআর.২৬