
সাধন সরকার: আজ ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে পরিবেশ রক্ষার তাগিদ থেকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি-পরিবেশের সম্পর্ক সৃষ্টির সেই শুরু থেকেই। পরিবেশ-প্রকৃতিকে পাশ কাটিয়ে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সমুদ্র ও গাছপালা অক্সিজেন বিলিয়ে পৃথিবীর প্রাণিকুলকে বাঁচিয়ে রেখেছে; কিন্তু আবার সেই প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। মানুষ ও প্রকৃতির দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ প্রকৃতি ধ্বংসের খেলায় মেতেছে! একবিংশ শতাব্দীতে এসে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে তা হলো পরিবেশ দূষণ। জলবায়ু পরিবর্তন পুরো পৃথিবীর জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু করেছেন। প্রতি বছর ৫ কোটি করে বৃক্ষরোপণ করা হবে। প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এত বড় আয়োজন এর আগে চোখে পড়েনি। উদ্যোগটি অবশ্যই বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী ও প্রশংসার দাবিদার। এত বড় আয়োজন সফল করতে হলে জনসাধারণের সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে বড় আয়োজন হতে পারে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের দিনটিকে ঘিরে। পরিবেশ দিবসে ১৭ কোটি জনগণ যদি একটি করে গাছ লাগাই তাহলে ১৭ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। এদিনটিকে ঘিরে সবাইকে আহ্বান জানিয়ে বিশাল আয়োজনের ব্যবস্থা করলে একদিনে যেমন কোটি কোটি বৃক্ষরোপণ সম্ভব, অন্যদিকে মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা সম্ভব হবে। সমবেতভাবে মহৎ উদ্দেশ্যে দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে শুরু করে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লে কাজে দ্রুত সফলতা পাওয়া যাবে। একটি করে গাছ লাগানো একজনের জন্য যতটা সহজ, সবার সাড়া না মিললে কোটি কোটি বৃক্ষরোপণ ততটাই কঠিন। পৃথিবী নামক আমাদের এই ছোট্ট গ্রহটিকে রক্ষা করতে হলে সব ধরনের দূষণ বন্ধ করার পাশাপাশি প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায় এমন সব পদক্ষেপকে ‘না’ বলতে হবে। সবাইকে যার যার জায়গা থেকে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসতে হবে।
এ ধরণীতে নিঃস্বার্থ ও উপকারী বন্ধু হলো বৃক্ষ। বৃক্ষের ছায়াতলেই গড়ে উঠেছিল মানবসভ্যতা। তাই বৃক্ষ ছাড়া মানুষের অস্বিত্ব কল্পনা করা যায় না। এককথায় বৃক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রোধ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাসহ নৈসর্গিক শোভাবর্ধনে বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবেশের দূষণ রোধ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে গাছ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখে থাকে। অথচ নগরায়ণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর যন্ত্র-প্রযুক্তির মোহে অযাচিতভাবে বৃক্ষনিধন করা হচ্ছে। উজাড় হচ্ছে বন। ফলে দেখা দিচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বাড়ছে উষ্ণায়ন আর মানবসভ্যতা পড়ছে হুমকির মুখে। দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের মতো সামাজিক আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে সবার মাঝে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে হতে হবে বৃক্ষপ্রেমিক। পরিবেশ দিবস ছাড়াও অন্যান্য সময়ও গাছ লাগানো যেতে পারে। এখন সারা বছর ধরে গাছ লাগানো যায়। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোকে উপলক্ষ করে বৃক্ষরোপণ করলে সেটা ভালো কাজ দেবে। যেমন হতে পারে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ নিজ জন্মদিনে, সন্তানের জন্মদিনে, সন্তানের প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন, বিবাহ বার্ষিকীতে, বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের নামে,পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনে বা অন্য কোনো বিশেষ দিনে।
পরিবেশের দূষণ ও বিপর্যয়সহ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দিক দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর একটি। উষ্ণায়ন বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে ভুগছে দেশ। ফলে নানাবিধ ক্ষতির সঙ্গে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগও। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে ভালো উপায় হচ্ছে বেশি বেশি করে গাছ লাগানো। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন; কিন্তু প্রয়োজনীয় বনভূমি বাংলাদেশে নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বনবিষয়ক এক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশের মোট ভূখন্ডের সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। যদিও সরকারি হিসাবে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৭ শতাংশ বলা হয়ে থাকে! মানুষের সচেতনতা, কমিউনিটি উদ্যোগ এবং সরকারের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির কারণে লোকালয়ে গাছের সংখ্যা বাড়ছে। এমন সব প্রশংসনীয় ও সামাজিক আন্দোলন অব্যাহত থাকলে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি) অর্জন সহজ হবে। রাজধানী ঢাকা শহরসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহর এলাকায় অনেকের ইচ্ছা থাকলেও জায়গার অভাবে গাছ লাগাতে পারেন না। এক্ষেত্রে ‘ছাদবাগান’ কর্মসূচির মাধ্যমে গাছ লাগানো যেতে পারে। নগরের সৌন্দর্য বাড়াতে এবং প্রায় ২ কোটি মানুষের প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পার্কে-উদ্যানে, সড়কের চারপাশে, নদী কিংবা খালের পাশে ও বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে হবে। পরিবেশের অবক্ষয় রোধে ও দারিদ্র্য বিমোচনে বৃক্ষরোপণ ব্যাপক সহায়ক।
বৃক্ষ মানুষকে মহৎ করে তোলে, শুদ্ধতা অর্জনের জন্যও বৃক্ষমুখী হওয়ার বিকল্প নেই। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশু-কিশোরদের যদি বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন দেশ ভরে উঠবে সবুজে সবুজে। বৃক্ষরোপণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী হতে হবে। কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে সবুজ বাংলাদেশ গড়তে নিজেদেরই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। ৫ জুন দিনটি হোক বৃক্ষরোপণের। দেশের ছোট-বড় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রেললাইন ও সড়কের পাশে, সরকারি-বেসরকারি অফিস, রাস্তার দুই পাশে, পতিত ও খাস জমিতে, উপকূলীয় এলাকায়, গৃহস্থালির আঙিনায় ও বাড়ির ছাদসহ অন্যান্য জায়গায় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। দরকার শুধু চেষ্টা ও রক্ষণাবেক্ষণের যথাযথ উদ্যোগ। পরিবেশ দিবসে প্রত্যেকে একটি করে বৃক্ষরোপণ করলে বদলে যাবে দেশ। প্রাকৃতিক বন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সামাজিক ও গৃহস্থালি বনায়নের প্রতি আরও জোর দিতে পারলে বনভূমির পরিমাণ ২৫ শতাংশে উন্নীত করা অসম্ভব নয়।
দ.ক.২৬