
আসাদ ঠাকুর, অমনিবাস: অপরূপ সুন্দরের সম্মিলন রয়েছে আমাদের সোনার বাংলায়। বাংলাদেশের সৌন্দর্য নানা রকমভাবে ফুটে উঠছে বিভিন্ন অঞ্চলভেদে। সেখানে চুনারুঘাট উপজেলার সৌন্দর্যও উল্লেখযোগ্য। সমগ্র সিলেটই সবুজে ঘেরা। প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডাকছে পর্যটকদের। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুতেই প্রকৃতির অপরূপে সৌন্দর্যের সঙ্গে মিল রেখে নিজেকে ফুটিয়ে তোলে।
শীতকালে শীতের তীব্রতা যেমন থাকে, বর্ষায় উজানের পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদী ও সুতাংছড়ার পানি উপচে পড়া তীব্র স্রোতে স্রোতাস্বেনী হয়ে উঠে হবিগঞ্জের হাওর-বাওড়সহ সব খালবিল। গ্রীষ্মে প্রখর রোদে মাঠ ঘাট চৌচির হয়ে ওঠার উপক্রমও হয় চুনারঘাটে।
বর্ষায় চুনারঘাটের চা-বাগানের সবুজপাতাগুলো নিজেদেরকে বিকশিত করে তোলে। চা-বাগানের সবুজ যেন সব ভালোলাগাকে ছাপিয়ে তোলে। দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি’র সৌন্দর্য পরতে পরতে সাজিয়ে রাখে, সঙ্গে ছায়া বৃক্ষগুলো একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে যেন সবুজ চা-বাগানের সৌন্দর্যকেই পাহারা দিচ্ছে। এ যেন প্রকৃতির অনাবিল প্রশান্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে সারা চুনারঘাট জুড়ে। পুরো চুনারঘাট জুড়েই রয়েছে প্রশান্তি মেশানো এই চা বাগান। আদি অ-কৃত্রিম চা বাগানগুলোর অপার সৌন্দর্য কত না বিস্তৃত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সমগ্র চুনারঘাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কতভাবে নয়নাভীরাম হয়ে উঠতে পারে তা স্বচক্ষে না দেখলে বোঝার উপায় থাকে না।
চুনারঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান যেন এক অপার সৌন্দর্যের লীলা ভূমি। নানারঙ্গে, নানাঢঙ্গে ভালোবাসা লুকিয়ে রয়েছে সেখানে। দেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন রেমা কালেঙ্গার সৌন্দর্য যেন প্রকৃতি নিজ হাতে সব সৌন্দর্য একসাথে ঢেলে সাজিয়ে রেখেছে। একপাশে বিশালাকৃতির পাহাড় আর পাহাড় থেকে হিম ছড়ানো হাওয়ার আদর মন ভরিয়ে দেবে যে কারও।
চুনারঘাটের আরেক সৌন্দর্য উপজেলার দেউন্দি চা বাগানের ভেতরে অবস্থিত লাল শাপলার বিল পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ তৈরি করেছে। প্রতিবছর শীত মৌসুমে বিলটিতে ফোটে অজস্র লাল শাপলা। চারদিকে চা বাগান আর মাঝখানে লাল শাপলার বিল যেন প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য। প্রতিবছর শরতের আগমন থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত ভোরের আলোয় দেউন্দি চা বাগানের বিলটি লাল শাপলায় রঙিন হয়ে ওঠে। কুয়াশার চাদরে মোড়া সকাল আর পাখির কলতান মিলিয়ে এখানকার পরিবেশ অতুলনীয়। পাহাড়, আকাশ আর শাপলার সৌন্দর্য মিলিয়ে এটি যেন অন্য এক অনুভূতি। তাই পর্যটকরা মন ভরে উপভোগ করেন শাপলার সৌন্দর্য।
ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বিলটি এখন ‘শাপলা রাজ্য’ নামে পরিচিত। শাপলার বিল ঘোরার পাশাপাশি চারদিকে ঘেরা পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য সহজে কেড়ে নেয় পর্যটকদের মন। এতে দিন দিন পর্যটক বাড়ছে চুনারঘাটে।
চুনারুঘাট সংলগ্ন তেলিয়াপাড়ায় মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সেনা সদরদপ্তর বা হেডকোয়ার্টার অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল ঐতিহাসিক এই স্থানেই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের এক সভায় সমগ্র বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভারত সীমান্ত ঘেঁষে তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে অবস্থিত। বাগানের ভেতর পিচঢালা আঁকাবাঁকা রাস্তা। সমতল ও টিলাময় এই চা বাগান মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি বর্ণাঢ্য ইতিহাস। স্থানটি কেবল মুক্তিযুদ্ধের শুরুর স্মৃতিই বহন করে না, বরং এটি নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাস শিক্ষার অন্যতম একটি প্রামাণ্য স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই স্থানটির ঐতিহাসিক পটভূমি ও ৪ এপ্রিলের তাৎপর্য সংগ্রামের ঐতিহাসিক দলিল। যেখানে ঘুরতে আসেন দেশের হাজারও দেশপ্রেমিক।
এছাড়াও চুনারঘাটের মিরাশি। যে গ্রাম স্বর্ণপ্রসবিনী, যেখানে ছিল ১৮টি জমিদার পরিবারের বাস। মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার সিআর দত্তের বাড়ি, আসাম সরকারের তৎকালিন শিক্ষামন্ত্রী প্রমোদ রঞ্জন দত্তের বাংলো, ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মিরাশী উচ্চ বিদ্যালয়, যে স্কুলের কৃতি শিক্ষার্থী যেমন গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ইঞ্জিনিয়ার ড. ক্ষিতিশ চন্দ্রনাথ, ইঞ্জিনিয়ার হাজি মতিন ও ইঞ্জিনিয়ার আজিজুর রহমান স্বমহিমায় মহিমান্বিত, যে গ্রামে রয়েছে সিআর দত্ত মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সৌধ! যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাসের ছাত্ররা আসেন।
ইতিহাস আরও বলে, ১৩০০ শতকের সিলেট অঞ্চলের খণ্ড রাজ্য তরফ পরগনার ঐতিহ্যকে লালন করে আমাদের এই চুনারঘাট। যা সিলেটের ধর্মীয় শিষ্টাচার পরিপালনের ইতিহাসও উঠে আসে ১২০ আউলিয়ার দরগা থেকে। দরগার অন্যতম হযরত নাসির উদ্দিন (রা.) এর মাজার জিয়ারত করতে দেশ বিদেশ থেকে অনেকে মুড়ারবন্দে আসেন।
উপমহাদেশের শ্রেষ্ট গণসঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম হবিগঞ্জ জেলার চুনারঘাট উপজেলায়। সঙ্গীত সম্রাটের স্মৃতি বিজড়িত সংস্কৃতির পরিমণ্ডল দর্শনেও আসে অনেকে।
চুনারঘাটের সাথে সারাদেশের যোগাযোগ সড়কপথ, রেলপথ সব মাধ্যমেই করা যায়। জেলা শহর থেকে খুব সহজেই চুনারঘাটের বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলোতে যাতায়াত করা যায়। এছাড়াও হবিগঞ্জে অসংখ্য হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। যেখানে পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তাসহ আরামদায়ক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
চুনারঘাটের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের স্পটগুলো হয়ে উঠতে পারে অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। যা দেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
চুনারঘাট যেন বিশ্বের বুকে একবিন্দু ইতিহাসের আখ্যান।
দ.ক.সিআর.২৬