
পারভেজ হাসান, লাখাই: হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। কর্মস্থল লাখাইয়ে হলেও অধিকাংশ শিক্ষক সপরিবারে বসবাস করছেন হবিগঞ্জ জেলা শহরে। ফলে প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে বিদ্যালয়ে পৌঁছাচ্ছেন তারা। এতে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান এবং ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় অভিভাবকরা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সকাল ৯টায় ক্লাস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষক সকাল ১০টা, সাড়ে ১০টা এমনকি ১১টার দিকেও বিদ্যালয়ে পৌঁছান। সোমবার (১৮ মে) সকালে উপজেলার বুল্লা বাজার এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাকে দূরপাল্লার বাস থেকে নামতে দেখা যায়।
সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে হবিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা একটি লোকাল বাস বুল্লা বাজারে পৌঁছালে কয়েকজন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষককে নামতে দেখা যায়। তখন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যালয়ে পাঠদান চলমান থাকার কথা। এর কিছুক্ষণ পর আরও দুটি বাস থেকে কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষিকাকে বাজার এলাকায় নামতে দেখা যায়। এ সময় কেউ কেউ বাজারে ঘোরাঘুরি ও আড্ডায় ব্যস্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়রা জানান, বুল্লা বাজার থেকে অনেক বিদ্যালয় কয়েক কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত। বাজারে পৌঁছাতে যদি সকাল ১০টা বা সাড়ে ১০টা বেজে যায়, তাহলে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয়ে যায়। আবার বিকেলের আগেই অনেক শিক্ষক শহরে ফেরার জন্য তড়িঘড়ি করে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা দাবি করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়েই শিক্ষকরা নিয়মিত দেরিতে আসেন এবং তদারকির অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে দেরিতে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর অভিযোগ থাকা এক প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে রাতে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের খেলাধুলা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কারণে দেরি হয়েছে। তবে বিদ্যালয়ে আগে উপস্থিত হয়ে হাজিরা না দিয়ে সরাসরি খেলাধুলার মাঠে যাওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
লাখাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন শিক্ষকদের অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, “আমার অফিসে ১১ জন জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ জন। জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত বিদ্যালয় তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “লাখাই উপজেলার অনেক শিক্ষক দেরিতে বিদ্যালয়ে আসতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। চেষ্টা করেও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
এ বিষয়ে শিক্ষা বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল কাইয়ুম বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনের ভিত্তি। শিক্ষকরা যদি নিয়মিত সময়মতো বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হন, তাহলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ ও শিক্ষার মান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি চরম অবহেলা।”
তিনি আরও বলেন, “বিদ্যালয়ভিত্তিক মনিটরিং জোরদার ও শিক্ষকদের আবাসন সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান না করলে এই সংকট আরও গভীর হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
দ.ক.সিআর.২৬