
মো. সিদ্দিকুর রহমান: আগামী প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিশুদের বিষয়ে সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিশুদের সম্পর্কে যথাযথ, সুষ্ঠু ও শিশুবান্ধব পরিকল্পনার অভাবে স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় অতিক্রান্তের পরও আজও শিশু শিক্ষা পর্যুদস্ত।
আমাদের দেশের শিশু শিক্ষা যেমন খুশি তেমন ভাবে চলে আসছে। যখন যে সরকার আসে, সে সরকারের মন্ত্রী, সচিব ও মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা তাদের মতো করে চালাচ্ছে। আর ব্যবসায়ী ভিত্তিতে পরিচালিত শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে ব্যক্তির আর্থিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে। সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষা চলছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক। বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষা চলছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী। এনজিওর শিশু শিক্ষা চলছে, তাদের নিয়ম মোতাবেক। এবতেদায়ী মাদরাসার শিশু শিক্ষা চলছে, কিছুটা মাদরাসা অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী।
হরেক রকম নীতিমালায় চলছে শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা। অভিন্ন শিশুবান্ধব নীতিমালায় না আনা হলে সমৃদ্ধ শিশু শিক্ষা, শৃঙ্খলা তথা যথাযথ উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রথমত: সকল ধরনের শিশু শিক্ষাকে একই মন্ত্রণালয় তথা কর্তৃপক্ষের অধীনে ন্যাস্ত করা।
দ্বিতীয়ত: সকল শিক্ষককে শিশু শিক্ষায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত, যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া উচিত। শিক্ষকের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নামিয়ে আনতে হবে।
তৃতীয়ত: ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা, খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তথা সংগীত সকল শিশুর জন্য অভিন্ন হওয়া। শিক্ষক নিয়োগের পূর্বে উপরিউক্ত বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্নকে নিয়োগ প্রদান করার দরকার।
শিশুদের শিক্ষককে হতে হবে সকল বিষয়ে পারদর্শী। তাদের জন্য বিশেষজ্ঞ ধর্মীয়, শারীরিক, আর্ট, সংগীত শিক্ষকের প্রয়োজন নেই। রাজনৈতিক বিতর্কের অবকাশ নেই। শিক্ষককে সার্বিক জ্ঞান নিয়ে শিক্ষার্থীর মাঝে বিলিয়ে আগামীর সুনাগরিক হিসেবে তৈরির পথ সুগম করবে।
সকল শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিন্ন শিশুবান্ধব সময়সূচি থাকতে হবে। দুপুর ২টার মধ্যে পাঠদান কার্যক্রম সমাপ্ত করার প্রয়োজন। যাতে দুপুরে হাত মুখ ধুয়ে বা গোসল সেরে দুপুরের গরম খাবার খেয়ে, খানিকটা বিশ্রাম অথবা ঘুমায়ে অবসাদ দূর করার পর, বিকেলে ফুরফুরে মেজাজে খেলাধুলা, বিনোদন উপভোগ করতে পারে। এর ফলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হয়ে থাকে। সন্ধার পর খানিকটা স্কুলের কাজ, টেলিভিশন দেখা শেষে রাতের খাবার খেয়ে প্রশান্তিতে ঘুমাতে পারে।
চতুর্থত: ৩ বা ৪ বা ৫ বছরের শিশুদের বিশেষজ্ঞ বানানোর প্রয়াসে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ধর্ম, সাধারণ জ্ঞানের নামে অসাধারণ জ্ঞান, কঠিন কঠিন ছড়া, ড্রইং, বই পড়ানোর কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি হোমওয়ার্ক, স্কুলের ওয়ার্ক নামে বিষয়ভিত্তিক ডজন খানেক খাতা, ডায়েরি, সিলেবাসের নামে বিশাল স্কুল ব্যাগ পরিপূর্ণ থাকে। এ ব্যাগ বহন করে অভিভাবকেরা অহংকার তথা তৃপ্তিতে গদগদ হয়ে উপভোগ করে থাকেন। তাদের ধারণা শিশু বিশাল পাঠের কার্যক্রম করে বড় শিক্ষিত হয়ে মহাবিপ্লব সৃষ্টি করবে।
শিশুর এ মহাজ্ঞানী করার উদ্যোগ তাকে অনেকটা অজ্ঞান করে ফেলে। শিশু তার পরিবেশের সম্পর্কে মোটামুটি জ্ঞান আহরণের পর, সে বিদ্যালয় পরিবেশে লেখাপড়া শিক্ষার জন্য আগমন করবে। শিশুর পারিবারিক পরিবেশে বিশাল জ্ঞানের ভান্ডার রয়েছে। এ জ্ঞানের ভান্ডারকে উপেক্ষা বা পাশ কাটিয়ে ৩/৪ বছর বয়সের শিশুকে কিন্ডার গার্টেন, বেসরকারি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এবতেদায়ী মাদরাসা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টেনে হিঁছড়ে অক্ষরজ্ঞান যথা ক, খ, অ, আ, A, B, C, D, ১, ২, আরবি বর্ণমালা পড়া বা লেখা পড়ানো একেবারে অনুচিত।
পারিবারিক পরিবেশের পরিমণ্ডল থেকে শিশু অনেক জিনিসের নাম বা সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান অর্জন করে থাকে। শিশুর প্রথম লেখা শেখা তার মতো করে আঁকাজোকা। সহজ সহজ আনন্দদায়ক ছড়া, কবিতা, গান, কার্টুন দেখা, অর্থাৎ আনন্দের মাঝে বেড়ে উঠা। নিজের খেয়াল খুশি মতো আঁকাজোকার মাধ্যমে তার মধ্যে সৃজনশীলতা গড়ে উঠবে। ক্রমান্বয়ে এ হিবিজিবি আঁকার মাঝে নতুন নতুন জিনিস আঁকতে শিখবে। পরিবারের বড়দের উচিত পরিবেশের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা।
পঞ্চমত: প্রতিটি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুদৃশ্য, মনোরম খোলা, আলো বাতাস, খেলার মাঠ, খেলাধুলা, তথা বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিশুর শিক্ষালয় হতে হবে শিশুর মন ভুলানো আকর্ষণীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে। শহরাঞ্চলে বেশিরভাগ কিন্ডারগার্টেন শিশু শিক্ষার পরিবেশবিহীন আলো বাতাসবিহীন গৃহে। এসকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া জরুরি।
সকল শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা সম্পন্ন শিশু শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, অভিন্ন শিশুবান্ধব সময়সূচি, পাঠ্যবই, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি, বাৎসরিক ছুটি, সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোন অবস্থায় শিশুর শারীরিক ও মানসিক পর্যুদস্ত হয় এমন শিশু শিক্ষা কাম্য নয়। এ অবস্থার পরিসমাপ্তি দ্রুত প্রত্যাশা কাম্য।
দ.ক.সিআর.২৬