
দেশে শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়লেও শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এখনো উদ্বেগজনক হারে ঘটছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অসংখ্য শিশু।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন কারখানা, হোটেল ও বাসাবাড়িতে এখনো ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। স্কুলে থাকার কথা থাকলেও পেটের দায়ে তারা কাজে যোগ দিয়েছে। এমনকি ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের দেখা যায় পার্কে বা খোলা মাঠে ফুল , বেলুন , বাদাম বিক্রির মতো কাজে যুক্ত থাকতে ।
শিশু অধিকার কর্মীরা প্রায়ই বলেন, “আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। পরিবার ও সমাজ সচেতন না হলে , শুধু আইন দিয়ে শিশু অধিকার রক্ষা সম্ভব নয়।”
এদিকে শিশুদের জন্য কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয় এবং সবার জন্য শিক্ষা- এই প্রচারণা আরও জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার এখনো অনেক বেশি।
বাল্যবিবাহের হার এসব ক্যাম্পেইনের জন্য কমিয়ে আনা গেলেও , শিশুদের মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়ে অথবা কর্মরত শিশুদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ হতে দেখা যায় না ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমেও প্রায়ই কর্মরত শিশুদের ছবি অনেক আবেগময় কথার সাথে পোস্ট করা হয়ে থাকে । যেমন ‘পরিবারের প্রতি দায়িত্ব যেন শিশু রহিমাকে করে তুলেছে পরিণত হিসেবে’ অথবা ‘রাজীবের সংগ্রামী জীবন’ । এমন লেখা আমরা প্রায়ই দেখতে পাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে । এটাকে মিডিয়া এথিক্সে “Sympathy Porn” বা “Exploitation by Exposure” বলা হয়।
অর্থনৈতিক অবস্থা একজন শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার ঘটনার এমন প্রচারণা কি শিশু শ্রমের মতো ঘটনাকে ইতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তুলছে না? এতে সমাজের কাছে বার্তা যায় যে শিশুশ্রম খারাপ নয়, বরং গর্বের বিষয়। এছাড়াও কর্মরত অবস্থায় শিশুর মুখ স্পষ্ট করে ছবি তোলা, নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা – এটি শিশু অধিকার আইন ও UNICEF-এর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী সরাসরি লঙ্ঘন । এতে শিশুটি আরও ঝুঁকিতে পড়ে।
সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিশুদের হেল্পলাইন ১০৯৮ এ কল করলে ২৪ ঘণ্টা সহায়তা পাওয়া যাবে। শিশুর প্রতি যে কোনো সহিংসতা দেখলে এই নম্বরে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের সমাজে শিশুর প্রতি সহিংসতার সংজ্ঞা সম্পর্কে । সময় এসেছে পরিবর্তনের ।
“সংগ্রামী শিশু” না লিখে “শিশুশ্রমের শিকার” লিখতে হবে । শিশুটিকে নয়, সিস্টেমকে দায়ী করতে হবে – কেন সে স্কুলে নেই?
শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সবার দায়িত্ব।
লেখক : অধিকারকর্মী