
মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন, তখন তিনি শুধু একজন পেশাজীবীর কাছে যান না—নিজের জীবন, সন্তানের জীবন কিংবা প্রিয়জনের জীবন একজন চিকিৎসকের জ্ঞান, দক্ষতা ও সততার ওপর অর্পণ করেন। একজন চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রোনের প্রতি মানুষের এই আস্থা বহু বছরের। তাই সেই আস্থার জায়গাটিতে যদি সামান্যতম প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা পরিচয় গোপনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু একজন রোগীকে নয়, গোটা চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেশে কথিত ভুয়া চিকিৎসক, ভুয়া ডিগ্রি, জাল সনদ ও মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে কারও বিরুদ্ধে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার, কারও বিরুদ্ধে জাল সার্টিফিকেট বা ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা অবশ্যই যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে। কারণ অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণ—দুটি এক বিষয় নয়। তদন্ত ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা ন্যায়সংগত নয়। তবে অভিযোগের গুরুত্বও কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
একজন রোগী কীভাবে নিশ্চিত হবেন—যার কাছে তিনি চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন, তিনি সত্যিই স্বীকৃত ও নিবন্ধিত চিকিৎসক? তাঁর ডিগ্রি বৈধ কি না, শিক্ষাগত যোগ্যতা সত্য কি না, পেশাগত নিবন্ধন রয়েছে কি না—এসব তথ্য জানার সুযোগ সাধারণ মানুষের কতটুকু? এখানেই রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
দেশের সব চিকিৎসকের সনদপত্র ও পেশাগত নিবন্ধন যাচাই করা জরুরি। তবে এই যাচাই যেন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে না হয়; বরং দেশের সব নিবন্ধিত চিকিৎসকের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা উচিত। এতে যেমন প্রকৃত চিকিৎসকদের মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে, তেমনি ভুয়া পরিচয়ে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হবে।
একজন প্রকৃত চিকিৎসক হতে বছরের পর বছর কঠোর অধ্যয়ন, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও পেশাগত নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। একজন চিকিৎসক তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পেছনে জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন। অথচ কেউ যদি জাল সনদ বা ভুয়া ডিগ্রির মাধ্যমে একই পরিচয় ব্যবহার করেন, তাহলে তা প্রকৃত চিকিৎসকদের প্রতি অন্যায় এবং রোগীদের জন্য সম্ভাব্য বড় ঝুঁকি।
বিশেষ করে চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক সময় টাকা দিয়ে পরিশোধ করা যায় না। ভুল রোগ নির্ণয়, ভুল ওষুধ, ভুল চিকিৎসা কিংবা জরুরি মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত একজন মানুষের জীবনে স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই চিকিৎসকের যোগ্যতা যাচাই কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
একই সঙ্গে খুঁজে দেখা প্রয়োজন—যদি কোথাও জাল সনদ তৈরি হয়ে থাকে, তা কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে? কীভাবে এসব কাগজপত্র যাচাই ছাড়াই ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে? কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী বা সংঘবদ্ধ চক্র এতে জড়িত কি না? হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়োগের সময় শিক্ষাগত সনদ ও নিবন্ধন যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তবে এই উদ্যোগ যেন হয় অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে; হয়রানির উদ্দেশ্যে নয়, রোগীর নিরাপত্তার স্বার্থে।
কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করতে হবে।
প্রয়োজনে দেশের চিকিৎসকদের জন্য একটি সহজলভ্য কেন্দ্রীয় অনলাইন যাচাই ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যেতে পারে। রোগী বা তাঁর স্বজন যেন চিকিৎসকের নাম ও নিবন্ধন নম্বর দিয়ে সহজেই জানতে পারেন—তিনি কোথায় পড়াশোনা করেছেন, তাঁর পেশাগত নিবন্ধন বৈধ কি না এবং তিনি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য অনুমোদিত কি না।
চিকিৎসকের প্রতি মানুষের আস্থা অমূল্য। সেই আস্থা রক্ষা করা যেমন প্রকৃত চিকিৎসকদের দায়িত্ব, তেমনি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব হলো প্রতারক বা অযোগ্য ব্যক্তির কারণে সেই আস্থা নষ্ট হতে না দেওয়া।
আমরা চাই না কোনো নির্দোষ চিকিৎসক অযথা হয়রানির শিকার হন। আবার এটাও চাই না, কোনো ভুয়া পরিচয়ের মানুষ একজন অসহায় রোগীর জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ পান। তাই সময় এসেছে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দেশব্যাপী চিকিৎসক সনদ যাচাই কার্যক্রমের।
সনদ যাচাই হোক, নিবন্ধন যাচাই হোক, শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই হোক। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর প্রকৃত চিকিৎসকরা পান তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা।
কারণ চিকিৎসা কোনো সাধারণ পেশা নয়। এখানে একজন মানুষ তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—জীবন—অন্যের হাতে তুলে দেন। সেই জীবন যেন কখনো ভুয়া পরিচয়, জাল সনদ কিংবা প্রতারণার কাছে জিম্মি না হয়।
প্রকৃত চিকিৎসকের মর্যাদা রক্ষা হোক, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক—সবার আগে মানুষের জীবন।
লেখক; সাংবাদিক ও কলামিস্ট