
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হওয়ার পেশা নয়; এটি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার এক মহান অঙ্গীকার। একজন সাংবাদিকের কলমের শক্তি রাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, সমাজের অন্যায়-অবিচারকে সামনে আনতে পারে, আবার সাধারণ মানুষের ন্যায্য দাবিকেও রাষ্ট্রের দরবারে পৌঁছে দিতে পারে। তাই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো নিরপেক্ষতা, সততা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থ।
একজন মানুষের ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ, বিশ্বাস বা আদর্শ থাকতে পারে। সেটি তার সাংবিধানিক অধিকার। একজন সাংবাদিকও এর ব্যতিক্রম নন। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত বিশ্বাস যখন প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডে রূপ নেয়, যখন তিনি কোনো দলের সমাবেশে কর্মী বা সমর্থকের ভূমিকায় অংশ নেন, দলীয় প্রচারণায় যুক্ত হন কিংবা নিজের সংবাদ পরিবেশনকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের আলোকে পরিচালিত করেন, তখন সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকের পরিচয় তার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বড়। কারণ তিনি কেবল একটি গোষ্ঠীর জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য কাজ করেন। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সুখ-দুঃখ, অধিকার-বঞ্চনা, উন্নয়ন ও সংকটের কথা তুলে ধরা তার দায়িত্ব। তিনি জনগণের চোখ, জনগণের কান এবং অনেক সময় জনগণের কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে পরিচালিত হয়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে।
বর্তমান সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাবে কিছু সাংবাদিককে প্রকাশ্যে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। কেউ সরাসরি দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন, কেউ রাজনৈতিক প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন, আবার কেউ সংবাদ পরিবেশনের পরিবর্তে মতাদর্শ প্রচারে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এতে শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাই ক্ষুণ্ন হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তি।
সংবাদ ও মতামতের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সংবাদ হবে তথ্যনির্ভর, যাচাইকৃত এবং পক্ষপাতহীন। অন্যদিকে মতামত হতে পারে ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ। কিন্তু যখন সংবাদই মতামতের রঙে রঞ্জিত হয়, তখন পাঠক, দর্শক কিংবা শ্রোতা বিভ্রান্ত হন। সত্যের পরিবর্তে যদি পক্ষপাত প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সংবাদমাধ্যম তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—বিশ্বাসযোগ্যতা—হারিয়ে ফেলে।
সাংবাদিকতার ইতিহাস আমাদের শেখায়, সমাজের বড় বড় পরিবর্তনের পেছনে নির্ভীক সাংবাদিকদের অবদান অপরিসীম। তাঁরা ক্ষমতার নয়, সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অন্যায় যেখানেই ঘটুক, অপরাধী যে-ই হোক, তাঁরা সত্য প্রকাশে আপস করেননি। এই আদর্শই সাংবাদিকতার প্রকৃত সৌন্দর্য। কোনো সরকারের প্রশংসা বা সমালোচনা—উভয়ই হতে পারে, কিন্তু তার ভিত্তি হতে হবে তথ্য, যুক্তি ও জনস্বার্থ; দলীয় আনুগত্য নয়।
একজন সাংবাদিকের জন্য নিরপেক্ষ থাকা সব সময় সহজ নয়। নানা ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা পেশাগত চাপ কাজ করতে পারে। কখনো বিজ্ঞাপনদাতা, কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, কখনো রাজনৈতিক শক্তি—বিভিন্ন দিক থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু এসব চাপের মধ্যেও যিনি সত্য ও নৈতিকতার পথ থেকে সরে যান না, প্রকৃত অর্থে তিনিই একজন পেশাদার সাংবাদিক।
সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা রক্ষা করা আজ সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। একটি ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ মুহূর্তেই বিভ্রান্তি, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাংবাদিকতার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি শিরোনাম এবং প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সামাজিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব কখনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থের কাছে সমর্পণ করা যায় না।
এ কথা সত্য যে একজন সাংবাদিকও একজন নাগরিক। তাঁরও ভোটাধিকার আছে, ব্যক্তিগত চিন্তা আছে, রাজনৈতিক দর্শন থাকতে পারে। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সেই ব্যক্তিগত অবস্থানকে আড়াল করতে পারাই তাঁর নৈতিক শক্তির পরিচয়। একজন দক্ষ বিচারকের যেমন আদালতে ব্যক্তিগত অনুভূতির স্থান নেই, তেমনি একজন সাংবাদিকেরও সংবাদ পরিবেশনে ব্যক্তিগত বা দলীয় পক্ষপাতের স্থান থাকা উচিত নয়।
গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। এই স্তম্ভ যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যায়। তাই সাংবাদিকের স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি তার নিরপেক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা মানে কোনো পক্ষের হাতিয়ার হয়ে ওঠা নয়; বরং সব পক্ষের ঊর্ধ্বে থেকে সত্য অনুসন্ধানের সাহস অর্জন করা।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। সাংবাদিক সমাজকে নিজেদের পেশাগত নৈতিকতা আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে। সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, প্রতিবেদক—সবারই মনে রাখা উচিত, মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে বহু বছর লাগে, কিন্তু সেই বিশ্বাস হারাতে একটি ভুলই যথেষ্ট। তাই দলীয় পরিচয়ের চেয়ে পেশাগত পরিচয়কে বড় করে দেখতে হবে, ব্যক্তি আনুগত্যের চেয়ে সত্যের প্রতি আনুগত্যকে মূল্য দিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সাংবাদিক যদি জনগণের প্রতিনিধি থেকে কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি সংবাদমাধ্যম নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ, গণতন্ত্র এবং সত্যের সংস্কৃতি। সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি নিরপেক্ষতায়, সাহসে এবং জনস্বার্থে। একজন প্রকৃত সাংবাদিক কখনো ক্ষমতার মুখপাত্র নন; তিনি জনগণের বিশ্বাসের রক্ষক। সেই বিশ্বাস অটুট থাকুক, সত্যের কলম হোক নির্ভীক, আর সাংবাদিকতা ফিরে পাক তার চিরন্তন মর্যাদা—এই প্রত্যাশাই আমাদের সকলের।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
দ.ক/এমআরএস