
সৃষ্টির বিশাল আয়োজনের দিকে তাকালে মানুষ নিজেকে এক আশ্চর্য সৃষ্টি হিসেবে আবিষ্কার করে। সীমাহীন মহাবিশ্ব, অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ, প্রাণী ও উদ্ভিদের মাঝে মানুষকে দেওয়া হয়েছে চিন্তার শক্তি, বিবেক, অনুভূতি, বিচারবোধ এবং সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা। মানুষ হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে, স্বপ্ন দেখে, প্রশ্ন করে, সৃষ্টি করে এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে পারে। তার চোখ শুধু পৃথিবী দেখে না—সে আকাশের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়, এই বিশাল সৃষ্টির পেছনে কে?
ধর্মীয় বিশ্বাসের ভাষায়, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে দিয়েছেন সম্মান, মর্যাদা ও দায়িত্ব। অথচ সেই মানুষই কখনো কখনো এমন এক আত্মভ্রমে আক্রান্ত হয় যে, নিজের অস্তিত্বের উৎসকেই অস্বীকার করতে শুরু করে। তখন মনে প্রশ্ন জাগে—যে মানুষ নিজের একটি কোষও নিজে সৃষ্টি করতে পারে না, সে কীভাবে তার সৃষ্টিকর্তাকেই অস্বীকার করার সাহস পায়?
মানুষ কি করে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বেআক্কেল, বেআন্দাজি, বেআবরু, বেইজ্জত, বেইনসাফ, বেঈমান, বেকুব, বেখেয়ালি, বেপরোয়া, বেয়াদব, বেয়ারা, বেসামাল, বেহায়া, বেহিসাবি ও বেহুদা হয়ে ওঠে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে—স্রষ্টাকে অস্বীকার করা কেবল একটি বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়; অনেক সময় এটি মানুষের অহংকার, আত্মভোলা এবং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অজ্ঞতারও প্রকাশ।
মানুষ জন্মের আগে কোথায় ছিল—সে জানে না। কীভাবে তার অস্তিত্ব শুরু হলো—সে নিজের হাতে তা ঘটায়নি। মায়ের গর্ভে একটি অদৃশ্য সূচনা থেকে ধীরে ধীরে তার চোখ, কান, হৃদয়, মস্তিষ্ক, হাত-পা গড়ে উঠেছে। জন্মের পর সে নিজে নিজে কথা বলতে শেখেনি, হাঁটতে শেখেনি, এমনকি প্রথমবার শ্বাস নেওয়ার সিদ্ধান্তও তার নিজের ছিল না।
তবু বড় হয়ে মানুষ কখনো এমনভাবে আচরণ করে, যেন এই জীবন, এই শরীর, এই মেধা, এই সামর্থ্য—সবই তার নিজের অর্জন।
এখানেই শুরু হয় বিস্মৃতি।
মানুষ যখন নিজের সামর্থ্যকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করে, তখন সে স্রষ্টাকে ভুলে যেতে পারে। বিজ্ঞান তাকে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের ক্ষমতা দিয়েছে, প্রযুক্তি তাকে অসাধারণ সক্ষমতা দিয়েছে, জ্ঞান তাকে পৃথিবীর অনেক অজানা বিষয় জানতে সাহায্য করেছে। কিন্তু জ্ঞান যতই বাড়ুক, মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলো থেকেই যায়—আমি কে? কেন এসেছি? এই জীবন কেন? মৃত্যুর পর কী?
বিজ্ঞান আমাদের বলতে পারে হৃদয় কীভাবে স্পন্দিত হয়; কিন্তু হৃদয়ের অর্থ কী—সে প্রশ্ন ভিন্ন। বিজ্ঞান বলতে পারে মানুষ কীভাবে দেখতে পায়; কিন্তু সৌন্দর্য অনুভবের রহস্য সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা আরেক বিষয়। বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার করে; কিন্তু সেই নিয়মের চূড়ান্ত উৎস নিয়ে মানুষের দার্শনিক ও ধর্মীয় অনুসন্ধান চলতেই থাকে।
তাই জ্ঞান অর্জন এবং স্রষ্টাকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। প্রকৃত জ্ঞান বরং মানুষকে বিনয়ী করতে পারে। কারণ যত বেশি জানা যায়, ততই বোঝা যায়—অজানার পরিধি কত বিশাল।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার অহংকারে নয়, তার উপলব্ধিতে। সে যত বড়ই হোক, সৃষ্টির সামনে সে একজন সৃষ্টি মাত্র। আর একজন সৃষ্টি হিসেবে তার সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় হতে পারে—সে তার স্রষ্টাকে চিনতে চায়, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে চায় এবং তাঁর দেওয়া জীবনকে কল্যাণের কাজে ব্যবহার করতে চায়।
শেষ পর্যন্ত মানুষকে ফিরে যেতে হবে নিজের ভেতরে। সেখানে অহংকারের পরিবর্তে বিনয়, অবজ্ঞার পরিবর্তে কৃতজ্ঞতা, বেপরোয়ার পরিবর্তে দায়িত্ববোধ এবং অন্ধতার পরিবর্তে সত্যের অনুসন্ধান প্রয়োজন।
স্রষ্টা মানুষকে সর্বোত্তম অবয়ব দিয়েছেন—এটি শুধু শরীরের সৌন্দর্যের কথা নয়; এটি মানুষের বিবেক, বুদ্ধি, অনুভূতি ও নৈতিক সম্ভাবনার কথাও বলে। তাই সেই মানুষ যদি স্রষ্টাকে ভুলে যায়, তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি স্রষ্টার নয়—ক্ষতি মানুষের নিজের। কারণ স্রষ্টাকে অস্বীকার করলে স্রষ্টার মহিমা কমে না; বরং মানুষের নিজের অস্তিত্বের অর্থই তার কাছে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়।
তাই প্রশ্নটি শুধু—“স্রষ্টা আছেন কি নেই?”—এখানেই থেমে থাকা উচিত নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত— “আমি যে মানুষ হয়ে জন্মেছি, এই জীবন আমাকে কেন দেওয়া হয়েছে?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারার মধ্যেই হয়তো মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
দ.ক/এমআরএস