
হাবিব খোকন: জেলা শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননার জন্য লোকসংস্কৃতি ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক গবেষণা বিভাগে আবেদন করেছিলেন কাজী শাহেদ বিন জাফর। দীর্ঘদিনের গবেষণা, লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আলোকে অনেকের কাছেই তিনি এই সম্মাননার একজন যোগ্য দাবিদার।
তাঁর রচিত নবীগঞ্জের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে নবীগঞ্জ তথা হবিগঞ্জের মাটি, মানুষ, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ চিত্র উঠে এসেছে। ১৭৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে পুঁথি সাহিত্য, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং হযরত নাসির উদ্দীন (র.) ও হযরত শাহজালাল (র.)সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। মধ্যযুগীয় বাংলার মুসলিম সাহিত্যধারায় বিকশিত পুঁথি সাহিত্যের মূল্যবান উপাদানও এতে সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ নয়, লোকসংস্কৃতি গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
২০২৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ছিলটী ভাষার নাগরী অভিধান। নাগরী ভাষা ও লিপি সিলেটের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মূল্যবান সম্পদ। এই ভাষা ও লিপি নিয়ে গবেষণা এবং দলিলভিত্তিক কাজ ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে থাকবে বলেই প্রত্যাশা করা যায়। তাঁর এই গ্রন্থ কেবল একটি অভিধান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের প্রয়াস। ইসলামি চিন্তা চেতনা এবং ব্যবসায়ীদের সংবিধানসহ তাঁর আরও কয়েকটি গ্রন্থ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি পল্লী সাহিত্য নামে একটি সংগঠন ও সাহিত্যপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে লোকসংস্কৃতির চর্চাকে আরও বিস্তৃত করার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
এমন একজন গবেষক যখন জেলা শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননার জন্য আবেদন করেন, তখন একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। তিনি কি সত্যিই এই সম্মাননার অযোগ্য ছিলেন? যদি না হন, তাহলে ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে দেওয়া ২৯টি সম্মাননার মধ্যেও কেন তাঁর মতো একজন গবেষকের স্থান হলো না?
প্রকৃত সংস্কৃতিসেবীরা যখন যথাযথ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হন, তখন কষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। এমন সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কমলাকান্তের দপ্তর গ্রন্থের বিড়াল প্রবন্ধের বহুল উদ্ধৃত কথাটি মনে পড়ে, “তেলা মাথায় তেল দেওয়া মনুষ্যজাতির রোগ।”
হবিগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির ২০২০, ২০২১, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সম্মাননা প্রদান সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে ১২টি বিভাগের মধ্যে লোকসংস্কৃতি ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক গবেষণা বিভাগে প্রয়োজনীয় তথ্য ও আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলেন কাজী শাহেদ বিন জাফর। কিন্তু নির্বাচিতদের তালিকায় তাঁর নাম আসেনি।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় শুধু বলেছেন, “আশায় আছি।”
এই দুটি শব্দের মধ্যেই যেন একজন প্রকৃত সংস্কৃতিসাধকের জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে। যাঁরা সত্যিকার অর্থে সংস্কৃতির জন্য কাজ করেন, তাঁদের পথচলার প্রধান প্রেরণা সম্মাননা নয়, কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। স্বীকৃতি দেরিতে আসতে পারে, নাও আসতে পারে। কিন্তু সময় একদিন প্রকৃত অবদানের মূল্যায়ন করেই। তাই কাজী শাহেদ বিন জাফরের এই সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ কেবল একজন মানুষের প্রতিক্রিয়া নয়, এটি নীরবে কাজ করে যাওয়া অসংখ্য সংস্কৃতিসাধকের আশাবাদেরও প্রতিধ্বনি।
১৯৭০ সালের ৩ মার্চ হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জে জন্ম নেওয়া কাজী শাহেদ বিন জাফর ১৯৮৪ সালে ছড়া প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যজীবন শুরু করেন। এরপর শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং গবেষণাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে চলেছেন।
বর্তমানে তিনি রাগীব রাবেয়া নাগরী ইনস্টিটিউটের নাগরী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ছড়ালয় সিলেট ও দিগন্ত সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে দীর্ঘদিন ধরে লোকসংস্কৃতি, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং ভাষা ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
দ.ক/এইচ.কে