
ঝুমি পাল: আজকের দিনে একজন স্কুল শিক্ষার্থীর রুটিনটা কেমন? সকালের অ্যালার্ম, তাড়াহুড়ো করে কোচিং, তারপর স্কুল , বিকেলে আবার প্রাইভেট টিউটর, আর রাতে টেবিলে বসে গাদা গাদা গাণিতিক সূত্র বা জীববিজ্ঞান মুখস্থ করা। লক্ষ্য একটাই—পরীক্ষায় ‘এ প্লাস’ পেতে হবে।
কিন্তু একটু বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ভাবো তো, বিজ্ঞান কি আসলেই শুধু কয়েকটা সমীকরণ আর মোটা মোটা বইয়ের পাতায় বন্দি কোনো খাঁচা? একদমই না। বিজ্ঞান হলো একটা চশমা, যা চোখে পরলে চারপাশের চেনা পৃথিবীটা এক অদ্ভুত জাদুনগরী হয়ে ওঠে।
◾ বিজ্ঞানের ফিলিংস: আমরা যখন পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করি যে, “আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার”, তখন সেটা কেবলই একটা সংখ্যা। কিন্তু চোখ বন্ধ করে একবার ভেবে দেখেছ? তুমি যদি আলোর বেগে ছুটতে পারতে, তবে মাত্র ১ সেকেন্ডে পুরো পৃথিবীকে সাড়ে সাত বার চক্কর দিয়ে আসতে পারতে!
পাঠ্যবই আমাদের শেখায় মহাকর্ষের সূত্র। কিন্তু বিজ্ঞান আমাদের ভাবায় যদি একটা ব্ল্যাকহোলের কাছে তুমি চলে যাও, তবে তোমার সময়ের গতি ধীর হয়ে যাবে। তুমি যখন ফিরে আসবে, দেখবে তোমার বয়সী বন্ধুরা তোমার চেয়ে অনেক বুড়ো হয়ে গেছে! ব্যাপারটা এরকম: তুমি যদি ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি কোনো তীব্র মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে কিছু সময় কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসো, তবে দেখবে এক অদ্ভুত কাণ্ড! ব্ল্যাক হোলের তীব্র টানের কারণে সেখানে তোমার জন্য সময় অতিবাহিত হয়েছে খুবই ধীরগতিতে। ফলে, পৃথিবীতে থাকা মানুষের তুলনায় তোমার বয়স বেড়েছে অনেক কম। যখন তুমি পৃথিবীতে ফিরবে, তখন দেখবে তোমার সমবয়সী বা তোমার চেয়ে ছোট ব্যক্তিরাও তোমার চেয়ে অনেক বেশি বুড়ো হয়ে গেছে! আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের এই বিস্ময়কর ঘটনাটি মহাকাশবিজ্ঞানে ‘মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণ’ (Gravitational Time Dilation) নামে পরিচিত, যা প্রমাণ করে মহাবিশ্বে সময় সবার জন্য সমান নয়। আইনস্টাইনের এই জটিল তত্ত্বটি বাস্তব জীবনে কেমন দেখাবে তা যদি বুঝতে চাও, তবে হলিউডের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীভিত্তিক সিনেমা ‘ইন্টারস্টেলার’ (Interstellar)-এর কথা ভাবা যাক।
সিনেমায় দেখা যায়, নভোচারী কুপার ‘গারগানচুয়া’ নামের একটি বিশাল ব্ল্যাক হোলের খুব কাছে অবস্থিত ‘মিলার্স প্ল্যানেট’ নামের একটি গ্রহে অবতরণ করেন। ব্ল্যাক হোলের তীব্র মহাকর্ষের কারণে ওই গ্রহটিতে সময় এতটাই ধীর হয়ে গিয়েছিল যে, সেখানে কাটানো মাত্র ১টি ঘণ্টা ছিল পৃথিবীর ৭ বছরের সমান!
কুপার যখন সেই গ্রহে মাত্র কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে মূল মহাকাশযানে ফিরে আসেন, ততক্ষণে পৃথিবীতে অনেক বছর সময় পার হয়ে গেছে। সিনেমার শেষে কুপার যখন পৃথিবীতে ফিরে আসেন, তখন তিনি দেখতে পান তাঁর ফেলে যাওয়া ছোট্ট ১০ বছরের মেয়েটি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, অথচ কুপারের বয়স কিন্তু একটুও বাড়েনি!
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে সায়েন্স ফিকশনের গল্প মনে হলেও, এটিই হলো ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি অঞ্চলের নির্মম এবং বাস্তব পদার্থবিজ্ঞান। তীব্র মহাকর্ষ কীভাবে সময়কে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে, ইন্টারস্টেলার সিনেমাটি আমাদের সেটাই নিখুঁতভাবে দেখিয়েছে। এবার তাহলে বুঝো, স্টিফেন হকিং বা আইনস্টাইন কোনো জাদুকর ছিলেন না, তারা কেবল চারপাশের প্রকৃতিকে একটু ভিন্ন চোখে দেখার সাহস করেছিলেন।
◾ বিজ্ঞান কোনো সিলেবাস নয়, বিজ্ঞান একটি প্রশ্ন: আমাদের মনে হতে পারে, বইয়ে যা লেখা আছে সেটুকুই বিজ্ঞান। অথচ সত্যিটা হলো, বইয়ের বাইরে অজানার যে মহাসমুদ্র, সেটাই আসল বিজ্ঞান।
তোমার ঘরের কোণের মাকড়সাটা কীভাবে জ্যামিতিক নিখুঁত জাল বোনে?
বর্ষাকালে ব্যাঙগুলো কীভাবে বোঝে যে এখন গান গাওয়ার সময় হয়েছে?
দূর আকাশের যে তারার আলো দেখে তুমি মুগ্ধ হচ্ছো, সেই তারাটি হয়তো লক্ষ বছর আগেই মরে গেছে, কেবল তার আলো এতদিনে তোমার চোখে এসে পৌঁছাল!
বিজ্ঞান তোমাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। নিউটন যদি শুধু ভাবতেন “আপেল তো নিচেই পড়ে, এটা মুখস্থ করে রাখি”, তবে আজ আমরা কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাতে পারতাম না। প্রশ্ন করো কেন হলো?’ এবং ‘কীভাবে হলো?’।
◾ একাডেমিক বৃত্তের বাইরে পা রাখার উপায়: পরীক্ষার পড়া অবশ্যই পড়বে, কিন্তু তার পাশাপাশি বিজ্ঞানের আসল স্বাদ পেতে এই কাজগুলো করতে পারো:
বিজ্ঞানের জনপ্রিয় কিছু বই পড়ো।
ডকুমেন্টারি দেখো: অবসর সময়ে Cosmos, Our Planet বা বিভিন্ন সায়েন্স চ্যানেলের ভিডিও দেখতে পারো। ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যপট মানুষের কল্পনাশক্তিকে দারুণভাবে বাড়িয়ে দেয়।
◾ শেষ কথা: তুমিই আগামী দিনের বিজ্ঞানী:
আজ যে ছেলে বা মেয়েটি ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়া দেখছে আর ভাবছে মেঘ কীভাবে তৈরি হয়, সে-ই আগামী দিনের বিজ্ঞানী। জিপিএ বা সার্টিফিকেটের বৃত্তে নিজের কল্পনাকে আটকে রেখো না। বিজ্ঞান কোনো ভয়ের বিষয় নয়, বিজ্ঞান হলো আনন্দ, বিজ্ঞান হলো এক চিরন্তন অ্যাডভেঞ্চার।
বইয়ের পাতা ওল্টাও, তবে চোখ দুটো খোলা রাখো মহাবিশ্বের দিকে!
◾ নিজেকে অন্যদের থেকে এগিয়ে নিতে যা যা করণীয়: সায়েন্স অলিম্পিয়াড,ম্যাথ অলিম্পিয়াড, ফিজিক্স অলিম্পিয়াড, বায়োলজি অলিম্পিয়াড, কেমিস্ট্রি অলিম্পিয়াড, ন্যাশনাল স্টিম অলিম্পিয়াড, চিলড্রেন সায়েন্স কংগ্রেস সহ বিজ্ঞান সম্পর্কিত সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা আমাদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিভাকে আরো উন্মোচন করতে পারি। বিজ্ঞানকে আরো ভালোভাবে ফিল করার জন্য বিজ্ঞানচিন্তা মাসিক ম্যাগাজিন দারুন একটা চয়েস! আমি নিজেও ২০২০ থেকে এটা পড়ে আসছি
লেখক: ঝুমি পাল
অনার্স ১ম বর্ষ, রসায়ন বিভাগ, বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, হবিগঞ্জ।
দ.ক.সিআর.২৬