1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০০ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
‎বাহুবলে জিরার ট্রাক আটকে চাঁদা দাবির অভিযোগে ছাত্রদল নেতা হেলালসহ আটক ২ হবিগঞ্জ থেকে বালির ট্রাকে লুকিয়ে পরিবহন কালে ভারতীয় মালামাল জব্দ করেছে বিজিবি চুনারুঘাটে চোর চক্রের মূলহোতা মিজানকে বানিয়াচং থেকে আটক, ট্রাক্টর চুরির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬ এর উদ্বোধন জনবল সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে লাখাইয়ের চিকিৎসাসেবা  শেষে এসেও আলোচনার শীর্ষে এমপি ভ্রাতা সাইফুল; তফসিল ঘোষণা না হলেও জোরেশোরে বইছে আহম্মদাবাদে নির্বাচনী হাওয়া চুনারুঘাটে উলামা পরিষদের উদ্যোগে সিরাত মাহফিল ও হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা আগামীকাল  আহম্মদাবাদ ইউনিয়ন নির্বাচন: চেয়ারম্যান পদে নতুন চমক সংসদ সদস্য শাম্মী’র ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম গাজীপুর স্কুলের গভর্নিং বডির অভিভাবক প্রতিনিধি নোমান আহমেদ নির্বাচিত চুনারুঘাটে এক অসহায় বৃদ্ধা নারীর জমি দখলের পায়তারা করছে একটি ভূমিকেখো চক্র

তুষখালী কৃষক বিদ্রোহ: খাজনা শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের গণঅভ্যুত্থান

Reporter Name
  • প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

 

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ: বাংলার ইতিহাসে কৃষক আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার সংগ্রাম নয়; বরং এটি ছিল সামাজিক ন্যায়, মর্যাদা এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শাসনামলে সংঘটিত পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার তুষখালী কৃষক বিদ্রোহ দক্ষিণ বাংলার কৃষক সমাজের সেই সংগ্রামী চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যদিও এই বিদ্রোহ জাতীয় ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত, তবুও স্থানীয় ইতিহাস ও কৃষক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এর গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর।

তুষখালী বিদ্রোহ ছিল কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক আন্দোলন নয়; বরং এটি ছিল সাধারণ কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত ও সংগঠিত গণপ্রতিরোধ, যা খাজনা শোষণ ও জমিদারি নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক অবস্থান তৈরি করেছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ঔপনিবেশিক ভূমি ব্যবস্থার সংকট:  ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশরা বাংলায় যে জমিদারি ব্যবস্থা চালু করে, তা কৃষকদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। জমির প্রকৃত উৎপাদক কৃষক হলেও ভূমির আইনি মালিকানা চলে যায় জমিদার ও ইজারাদারদের হাতে। ফলে কৃষকরা হয়ে ওঠে অনিরাপদ প্রজা, যাদের ওপর খাজনার চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দক্ষিণ বাংলার নদীবিধৌত অঞ্চলগুলোতে কৃষি উৎপাদন অনিশ্চিত ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে কৃষকের আয় স্থিতিশীল ছিল না। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা করে ইজারাদাররা বারবার খাজনা বৃদ্ধি করে। তুষখালী এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যায়—খাজনার হার কয়েকগুণ বাড়ানো হয় এবং তা আদায়ে ব্যবহার করা হয় লাঠিয়াল বাহিনী ও প্রশাসনিক ক্ষমতা।
এই দীর্ঘমেয়াদি শোষণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে সংগঠিত প্রতিরোধের ভিত্তি তৈরি করে।

বিদ্রোহের সূচনাসংগঠন: ১৮৩০ সালের পর থেকে তুষখালী অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে এবং ১৮৭০-এর দশকে তা সুস্পষ্ট বিদ্রোহে রূপ নেয়। স্থানীয় কৃষক, জোতদার ও গ্রামীণ নেতৃত্ব মিলিতভাবে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন। সমকালীন সরকারি দলিলে কোনো নির্দিষ্ট প্রধান নেতার নাম স্পষ্টভাবে পাওয়া না গেলেও লোকগাঁথা ও আঞ্চলিক বর্ণনায় শম্ভুনাথ এবং এক জনৈক ‘নায়েব’-এর ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়।
কৃষকরা জোট বা কমিটি গঠন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়—সরকার নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত খাজনা দেওয়া হবে না। এই “নো-রেন্ট” বা খাজনা বন্ধ আন্দোলন বিদ্রোহকে সুসংগঠিত করে এবং গ্রামভিত্তিক ঐক্যের মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এই সংগঠন পদ্ধতি পরবর্তীকালের পাবনা কৃষক বিদ্রোহের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে কৃষকরা সম্মিলিতভাবে আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

সংগ্রামের প্রকৃতি ও প্রতিরোধ কৌশল
তুষখালী কৃষক বিদ্রোহ ছিল বহুমাত্রিক প্রতিরোধ আন্দোলন। কৃষকরা শুধু খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানাননি; তারা সক্রিয়ভাবে জমিদার ও ইজারাদারদের চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ইজারাদারদের লাঠিয়াল বাহিনী গ্রামে প্রবেশ করলে কৃষকরা দলবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। অনেক ক্ষেত্রে লাঠিয়ালদের গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হয়। খাজনা আদায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে, যা প্রশাসনের জন্য বড় সংকট তৈরি করে।

বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশ প্রশাসন পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট পাঠায়। কৃষকদের ভয় দেখাতে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার, তল্লাশি এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবুও দীর্ঘ সময় কৃষকরা ঐক্য বজায় রেখে প্রতিরোধ চালিয়ে যান—যা আন্দোলনের দৃঢ়তা ও সংগঠনের শক্তির প্রমাণ বহন করে।
বিদ্রোহ দমন ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া
প্রথমদিকে প্রশাসন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করতে চাইলেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। লাঠিয়াল বাহিনীর হামলা এবং পুলিশি অভিযানের পরও কৃষকদের ঐক্য ভাঙা সম্ভব হয়নি।
অবশেষে প্রশাসন উপলব্ধি করে যে সমস্যার মূল কারণ খাজনা ব্যবস্থার অসংগতি। ফলে সংঘাত প্রশমনের লক্ষ্যে নতুন করে জমি জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তুষখালী জরিপ ও ফলাফল
১৮৭০–৭১ সালের মধ্যে পরিচালিত “তুষখালী জরিপ” ছিল এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল। জরিপের মাধ্যমে জমির পরিমাণ, উৎপাদন ক্ষমতা এবং খাজনার যৌক্তিক হার পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এর ফলে— অতিরিক্ত খাজনা আরোপে নিয়ন্ত্রণ আসে কৃষকদের ওপর প্রশাসনিক নির্যাতন কিছুটা কমে ভূমি ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের সূচনা ঘটে
কৃষকদের স্বত্ব আংশিকভাবে স্বীকৃতি পায়
এই পরিবর্তনগুলো পরবর্তীকালে বৃহত্তর ভূমি সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়নে প্রভাব ফেলে বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।

কৃষক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তুষখালীর স্থান: তুষখালী কৃষক বিদ্রোহ বাংলার কৃষক আন্দোলনের ধারায় একটি সংযোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে। নীল বিদ্রোহ, পাবনা কৃষক আন্দোলন এবং পরবর্তী তেভাগা আন্দোলনের মতো বৃহত্তর সংগ্রামে যে সংগঠিত কৃষকচেতনা দেখা যায়, তার প্রাথমিক রূপ এই ধরনের আঞ্চলিক বিদ্রোহগুলোতেই গড়ে ওঠে। এটি প্রমাণ করে যে কৃষক সমাজ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন হয়ে উঠছিল এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করছিল।

বর্তমান প্রেক্ষাপট: ইতিহাসের প্রতিধ্বনি
সময়ের ব্যবধানে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তিত হলেও কৃষকের সংগ্রামের বাস্তবতা পুরোপুরি বদলায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে মঠবাড়িয়া অঞ্চলে খাল দখল, পানি প্রবাহে বাধা, কৃষিজমি নিয়ে বিরোধ এবং কৃষকদের প্রতিবাদ কর্মসূচি স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য তৈরি করে। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—তুষখালীর কৃষক সমাজ এখনও অধিকার রক্ষার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

উপসংহার: তুষখালী কৃষক বিদ্রোহ দক্ষিণ বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অপেক্ষাকৃত অবহেলিত অধ্যায়। এটি দেখিয়েছে যে নেতৃত্বহীন নয়, বরং জনগণই ছিল এই আন্দোলনের প্রকৃত নেতা। সাধারণ কৃষকদের ঐক্য, সাহস এবং ন্যায়বোধ একটি শক্তিশালী শোষণব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হয়েছিল।

এই বিদ্রোহ আমাদের শেখায়—ইতিহাস শুধু বড় শহর বা বিখ্যাত নেতাদের গল্প নয়; ইতিহাস গড়ে ওঠে গ্রামবাংলার মাটিতে, সাধারণ মানুষের সংগ্রামে। তুষখালীর নামহীন কৃষকদের সেই প্রতিবাদ আজও ন্যায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
.

দ.ক.সিআর.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews