
সুকৃতি সুশ্রী: গ্রামের নাম ফুলপুর। পুকুর, ধানের মাঠ, আর সন্ধ্যার পরেই নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া পথঘাট যেন রাত নামলেই অন্য কোনো জগতে রূপ নেয়। এখানে থাকে লাজুক, শান্ত স্বভাবের মেয়ে কুসুম। বয়স উনিশ। কলেজে যাওয়া মানে গ্রামের মেয়েদের চোখে একপ্রকার সাহসের চিহ্ন। কিন্তু কুসুমের ভেতরে আরেকটা দুনিয়া লুকিয়ে থাকে—একটা গোপন ভালোবাসা, যার নাম অনিক।
অনিক পাশের গ্রামের ছেলে। উঁচু ক্লাসে পড়ে, ছেলেটা রূপে-গুণে তুখোড়। ওদের পরিচয় হয়েছিল কলেজ ফেস্টে, তারপর ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ায়। ফোনে কথা, টুকটাক দেখা, আর রাতের বেলায় চুপিচুপি গ্রামের পেছনের বাঁশঝাড়ে মিলন।
সেদিন ছিল পূর্ণিমা রাত। কুসুম সারাদিন মন খারাপ করে ছিল। মা বুঝতে না পারলেও, তার মনটা ছটফট করছিল। রাত দশটার দিকে সবার ঘুমানোর পর, সে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। আঁচলটাকে মাথায় টেনে নিল—যেন রাতটাও লুকিয়ে রাখে তার ইচ্ছেগুলো।
বাঁশঝাড়ের পাশে অনিক দাঁড়িয়ে ছিল। গায়ে হালকা জ্যাকেট, হাতে একটা ছোট্ট বেলফুলের মালা।
“তুই আসবি জানতাম,” অনিক বলল মৃদু গলায়।
“না এসে পারি?” কুসুম হেসে এগিয়ে গেল।
চাঁদের আলোয় ওদের চোখে চোখ পড়ল। সেই চাহনি—যেখানে লজ্জা আছে, টান আছে, আর গভীর আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে। অনিক কুসুমের হাত ধরল, ধীরে ধীরে ওকে নিজের দিকে টেনে আনল। কুসুম একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু প্রতিবাদ করল না। এই ছেলেটার ছোঁয়ায় তার রক্ত গরম হয়ে ওঠে, বুক ধড়ফড় করে।
“আজ তোর গায়ে বেলফুলের গন্ধ,” অনিক বলল।
“তুই লাগিয়েছিস তো,” কুসুম ফিসফিস করে বলল, গাল লাল হয়ে উঠল।
অনিক ওর গালে এক হাত রাখল, নরম করে চুলগুলো সরিয়ে দিল। ঠোঁট ছুঁয়ে গেল কপালে, তারপর গাল ছুঁয়ে নামতে লাগল ধীরে ধীরে। কুসুম শিউরে উঠল, চোখ বন্ধ করে ফেলল। শরীর টানটান হয়ে উঠছিল, বুকের ভেতরটা যেন আগুন হয়ে জ্বলছিল।
পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসল দু’জন। নরম ঘাস, সোঁদা মাটির গন্ধ, আর চাঁদের আলোয় দুই তরুণ হৃদয়ের তৃষ্ণা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল।
“তোকে না ছুঁয়ে থাকতে পারি না,” অনিক বলল।
“ছুঁস তো… ছুঁয়ে থাক…” কুসুম বলল অস্পষ্ট গলায়।
অনিক ওর গলার কাছটায় ঠোঁট রাখল, ধীরে ধীরে আঙুল চালিয়ে দিল পিঠের ওপর। কুসুম নিঃশ্বাস টেনে বলল, “এই রাতটা আমার হয়ে থাক।”
ওদের ঠোঁট এক হয়ে গেল আবার—এইবার আরও গভীর, আরও আকুল। শরীরের ভাষা বুঝতে পারছিল কুসুম, বুঝতে পারছিল নিজের ভেতরের আকুলতা। হাত ধরল অনিকের গলা, আর ওর বুকের ওপর মাথা রাখল।
পেছন থেকে হালকা হাওয়া বইল, শাড়ির আঁচল উড়ল, আর অনিক বলল, “তোর শরীর জ্বলছে কুসুম।”
কুসুম বলল, “তুই তাতে ঘি ঢালছিস।”
তারা দু’জনেই হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসির নিচে ছিল ভয়ানক তীব্র আকর্ষণ, কিছুটা ভয়ও। এই রাত, এই শরীরী মুগ্ধতা, এই চুপিসারে ভালোবাসা—সবটাই ছিল তীব্র, কিন্তু ক্ষণিকের।
“আমরা কবে মুক্তভাবে ভালোবাসতে পারব?” কুসুম প্রশ্ন করল।
“একদিন সব জানিয়ে তোকে নিয়ে যাব,” অনিক বলল।
“তুই যদি আমায় ছেড়ে যাস?” কুসুমের গলা কেঁপে উঠল।
“তোর গায়ে আমার চিহ্ন আছে এখন,” অনিক ফিসফিস করে বলল, “আমার হাতের ছোঁয়া, আমার ঠোঁটের দাগ, আমার ভালোবাসা—সবকিছু তোর ভেতরে মিশে গেছে।”
রাত বাড়ছিল। কুকুরের ডাক, দূর থেকে আসা বাঁশির শব্দ, সব কিছুর মাঝেও ওরা যেন নিজেদের মধ্যে এক পৃথিবী গড়ে তুলেছিল। কুসুম এবার উঠে দাঁড়াল।
“চল, বাড়ি ফিরতে হবে। মা টের পেলে মরব,” কুসুম বলল।
অনিক ওকে টেনে নিল আবার কাছে, কানে ফিসফিস করে বলল, “কাল রাতে আবার দেখা হবে… তখন আরও গভীরে যাব।”
চাঁদ তখন মাথার ওপরে। কুসুম ধীরে ধীরে ফিরে চলল নিজের ঘরের দিকে। শরীর কাঁপছিল, মুখে লজ্জা, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত সুখ—এক ধরণের নারী হয়ে ওঠার অনুভূতি।
অনুগল্প; সুকৃতি সুশ্রী
দ.ক.সিআর.২৫