1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
সাধনা, জাগরণ ও সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় ৩৬ বছর অতিক্রম করলো চুনারুঘাট সাহিত্য পরিষদ মাধবপুরে আগুনে পুড়ে ছাই দুই ভাইয়ের বসতঘর, ক্ষতি ৫০ লাখ টাকা চুনারুঘাটে চলছে ‘বৈচিত্র্যের উৎসব’ ফয়সলের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় মতবিনিময় সভা বারে বারে আর আসা হবে না—জীবন নামের এই একবারের যাত্রা শিশুদের ‘নোবেল’ পুরস্কারে মনোনীত শেরপুরের জয়া বণিক নদীর চরকে নিজের সম্পত্তি দাবি করে দখল-বিক্রির হিড়িক, হুমকিতে নদীপাড়ের বাসিন্দারা পুরোনো স্থাপত্যে লুকিয়ে থাকা হবিগঞ্জের ইতিহাস: আসাদ ঠাকুর হবিগঞ্জে ৮১৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্যোগ 

বারে বারে আর আসা হবে না—জীবন নামের এই একবারের যাত্রা

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬

“তুমি ভেবেছো কি মনে, এই ত্রিভুবনে- তুমি যাহা করে গেলে, কেহ জানে না… বারে বারে আর আসা হবে না, এমনও মানব জনম আর পাবে না।”

কয়েকটি সহজ শব্দ, অথচ তার ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে একটি সমগ্র জীবনের আয়না। মানুষ প্রতিদিন কত কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে—অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, অহংকার, প্রতিযোগিতা, অভিমান, ভালোবাসা, বিরোধ আর ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনা। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও আমরা সবচেয়ে বড় সত্যটিকে প্রায়ই ভুলে যাই—এই জীবন একবারই পাওয়া যায়। সময় একবার চলে গেলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। আজ যে মানুষটি আমাদের পাশে, কাল হয়তো সে থাকবে না; আর যে সময়টুকু আজ আমাদের হাতে, আগামীকাল সেটিও কেবল স্মৃতি হয়ে থাকবে।
জীবন আসলে একটি অদ্ভুত সফর। জন্মের সঙ্গে শুরু হয়, তারপর শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য পেরিয়ে একদিন অজানা গন্তব্যের দিকে চলে যেতে হয়। কেউ আগে যায়, কেউ পরে; কিন্তু কাউকেই এই যাত্রা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় না। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষও মৃত্যুর সামনে অসহায়, সবচেয়ে ধনী মানুষও শূন্য হাতে বিদায় নেয়, আর সবচেয়ে সাধারণ মানুষটিও রেখে যায় তার কাজের চিহ্ন। তাই মানুষের আসল পরিচয় তার কত সম্পদ ছিল, কত ক্ষমতা ছিল কিংবা কত মানুষ তাকে ভয় পেত—তা নয়; বরং সে কতটা মানুষ হয়ে বেঁচেছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে।
আমরা অনেক সময় মনে করি, আমাদের কিছু কাজ কেউ দেখছে না। চারপাশের মানুষ জানে না, তাই হয়তো বিষয়টি গোপনই থেকে যাবে। কিন্তু মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া আর সত্যিই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। একজন মানুষ নিজের কাছ থেকে নিজেকে লুকাতে পারে না। তার বিবেক জানে সে কী করেছে, কেন করেছে এবং কার ক্ষতি করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থেকে কেউ মনে করেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাব রয়েছে; আবার মানবিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বলা যায়—প্রত্যেক কাজেরই কোনো না কোনো পরিণতি আছে।
তাই জীবনের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হলো—“তোমার বিচার করিবেন সেই বিধাতা, তাহার কাছে ফাঁকি-ঝুঁকি কিছু চলে না।” এই উপলব্ধি মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং দায়িত্বশীল করে তোলার জন্য। মানুষ যদি মনে রাখে যে তার প্রতিটি কাজের মূল্য আছে, তবে সে অন্যায় করার আগে অন্তত একবার থামবে, অন্যের অধিকার হরণ করার আগে ভাববে, কাউকে অপমান করার আগে নিজের অবস্থানটি উপলব্ধি করবে।
মানুষের একটি বড় দুর্বলতা হলো—সে অন্যের ভুল খুব সহজে দেখতে পায়, কিন্তু নিজের ভুলের সামনে দাঁড়াতে চায় না। আমরা অন্যের চরিত্র বিচার করি, অন্যের জীবন নিয়ে কথা বলি, অন্যের ব্যর্থতায় আনন্দ পাই; অথচ নিজের ভেতরের অন্ধকারটুকু দেখার সময় আমাদের হয় না। অথচ সত্যিকারের আত্মশুদ্ধি শুরু হয় নিজের দিকে তাকানোর মধ্য দিয়ে।
“তুমি যাহা বদনে করো নাই প্রকাশ,
অপ্রকাশ তাহার কাছে কি যে সর্বনাশ।”
মানুষের মুখ অনেক কথা গোপন করতে পারে। হাসির আড়ালে কষ্ট লুকানো যায়, কথার আড়ালে উদ্দেশ্য লুকানো যায়, অভিনয়ের আড়ালে চরিত্রও ঢেকে রাখা যায়। কিন্তু হৃদয়ের সত্যকে কতদিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব? মানুষের কাছে হয়তো কিছু বিষয় অপ্রকাশিত থাকতে পারে, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে তা অপ্রকাশিত নয়। আর সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসী মানুষের কাছে তো এই গোপনতার কোনো অর্থই নেই।
জীবন তাই শুধু বাহ্যিক সাফল্যের গল্প নয়; এটি ভেতরের মানুষটিকে গড়ে তোলারও গল্প। আমরা কী পেলাম—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কী দিলাম। কত টাকা জমালাম—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, কত মানুষের মুখে হাসি আনতে পেরেছি। কত বড় পদে বসেছি—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, সেই পদে থেকে কতটা ন্যায় করতে পেরেছি। কত মানুষ আমাদের প্রশংসা করেছে—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, আমাদের অনুপস্থিতিতে মানুষ আমাদের ভালোবেসে স্মরণ করবে কি না।

সময়ের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—“তোমার বেলা তো বহে যায়, আসে অন্ধকার।” সময় কখনো কারও জন্য অপেক্ষা করে না। ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে না, ঋতু ফিরে আসে ঠিকই, কিন্তু একই মানুষ, একই বয়স, একই মুহূর্ত আর ফিরে আসে না। শৈশব ফিরে আসে না, হারানো যৌবন ফিরে আসে না, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তও দ্বিতীয়বার ঠিক একইভাবে ফিরে আসে না।
তবু আমরা সময়ের মূল্য বুঝতে পারি না। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করি, অহংকারে প্রিয় মানুষকে দূরে ঠেলে দিই, ক্ষমতার মোহে অন্যায় করি, সামান্য স্বার্থের জন্য বন্ধুত্ব ও বিশ্বাস বিকিয়ে দিই। পরে যখন সময় ফুরিয়ে আসে, তখন আফসোস হয়। কিন্তু তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যায়।
এই পৃথিবীতে মানুষ কখনো দেবতার মতো হয়ে ওঠে, আবার কখনো নিজের আচরণেই মানবিকতার সীমা অতিক্রম করে ফেলে। একজন সাধারণ মানুষও তার ভালো কাজের মাধ্যমে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। একটি সৎ কথা, একটি ক্ষমা, একটি সহানুভূতির হাত, একটি বিপদে পাশে দাঁড়ানো—এসব ছোট কাজই কখনো কখনো একটি মানুষের পুরো জীবনকে অর্থবহ করে দিতে পারে। তাই “ভবা কহে, চোখ মেলে চেয়ে দেখো”—এই আহ্বানটি আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। চোখ মেলে দেখা মানে শুধু পৃথিবীকে দেখা নয়; নিজের জীবনকেও দেখা। আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? কী করছি? আমার কারণে কেউ কষ্ট পাচ্ছে কি না? আমার কোনো আচরণে কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না? যাদের ভালোবাসা পাওয়ার কথা, তাদের আমি ভালোবাসা দিচ্ছি কি না? জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের অতীতের দিকে তাকালে যেন নিজেকেই ঘৃণা করতে না হয়—এই সতর্কতাই প্রয়োজন।

মানুষের জীবন বড় নয়, কিন্তু জীবনের অর্থ বড় হতে পারে। একটি জীবন কত বছর বেঁচে ছিল—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই জীবন কতটা আলো ছড়িয়েছিল। কেউ শত বছর বেঁচেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে না; আবার কেউ অল্প সময়ের জীবনেই অসংখ্য মানুষের মনে অমর হয়ে থাকে।
আমাদের মনে রাখা উচিত—আমরা কেউই এই পৃথিবীতে স্থায়ী নই। আজ যে বাড়ি নিয়ে অহংকার, কাল সেটি অন্য কারও; আজ যে সম্পদ নিয়ে গর্ব, কাল সেটি উত্তরাধিকারীর; আজ যে ক্ষমতা নিয়ে দম্ভ, কাল সেটি অন্যের হাতে। কিন্তু মানুষের ভালো কাজ, ভালোবাসা, সততা ও মানবিকতার স্মৃতি অনেক দূর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
তাই জীবনকে প্রতিশোধে নয়, প্রীতিতে ভরিয়ে তুলি। ঘৃণার বদলে ক্ষমা করি, অন্যায়ের বদলে ন্যায়কে বেছে নিই, অহংকারের বদলে বিনয় ধারণ করি। কাউকে ছোট করার আগে ভাবি—আমিও তো একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব। তখন আমার সঙ্গে যাবে না আমার পরিচয়, পদ, অর্থ কিংবা ক্ষমতার অহংকার; থেকে যাবে শুধু আমার কর্মের স্মৃতি।
সত্যিই—“বারে বারে আর আসা হবে না।” এই একটি বাক্যই হয়তো আমাদের জীবনকে নতুন করে ভাবার জন্য যথেষ্ট। মানুষ আবার জন্মাবে কি না, সে বিশ্বাস যার যার নিজস্ব; কিন্তু এই মানবজীবনটি যে আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় একবারই পাওয়া—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
তাই যতদিন আছি, মানুষ হয়ে থাকি। কারও চোখের জল হওয়ার চেয়ে কারও মুখের হাসির কারণ হই। অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বদলে অধিকার ফিরিয়ে দিতে শিখি। কারণ একদিন আমাদেরও যেতে হবে। সেদিন পৃথিবীকে আমরা কিছুই সঙ্গে নিয়ে যেতে পারব না—শুধু রেখে যাব আমাদের কাজের গল্প।

জীবন নামের এই স্বল্প সফরে তাই একটু থামি, নিজের দিকে তাকাই, ভুলগুলো শুধরে নিই। কারণ সময়ের দরজা একবার বন্ধ হয়ে গেলে ফিরে এসে আর বলা যাবে না—“আরেকবার সুযোগ দাও, এবার ভালো মানুষ হয়ে বাঁচব।”
সুযোগটি এখনই। সময়টিও এখনই।
বারে বারে আর আসা হবে না—তাই এই একবারের মানবজীবনটুকু যেন সত্যিই মানুষের মতো করে বাঁচতে পারি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews