
হবিগঞ্জ শহরের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর অপচিকিৎসায় হরহামেশাই মারা যাচ্ছে প্রসূতি মা ও নবজাতক। ইতিপূর্বে চাঁদের হাসি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক গোলাম মস্তোফা রফিকসহ একাধিক রোগী মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটলেও আজ পর্যন্ত কোনোটিরই বিচারের মুখ দেখেনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
অভিযোগ রয়েছে, ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর পর রাতের অন্ধকারে অসহায় ও গরিব রোগীর স্বজনদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয় এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রফাদফা করে মামলা না করতে বাধ্য করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স এলাকায় চাঁদের হাসি জেনারেল হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস রোডে সূর্যমুখী জেনারেল হাসপাতাল, মাউন্ট এভারেস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মাদার কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সবুজবাগ এলাকার প্যানাসিয়া মেডিএইড অ্যান্ড ক্লিনিক, আক্তার মেডিকেল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারসহ ১১টি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। তাছাড়া হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসাবর্জ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও অপসারণ করা হচ্ছে, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
এছাড়া হবিগঞ্জের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, জীবন রক্ষাকারী ঔষধ চুরি এবং সিট ভাড়ার নামে গলাকাটা বাণিজ্যে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থেকে শুরু করে কেবিন ভাড়া—প্রতিটি ধাপে রোগীরা চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জারি করা ১০ দফা বিশেষ নির্দেশনায় এসব অনিয়ম বন্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছিল, যা হবিগঞ্জের ক্লিনিকগুলো কোনোভাবেই তোয়াক্কা করছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অপারেশনের আগে রোগীর স্বজনদের দীর্ঘ তালিকার ঔষধ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী বাইরে থেকে কিনে আনতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু এসব ঔষধ ওটি-তে ঢোকানোর পর তার বড় একটি অংশ রোগীর শরীরে প্রয়োগ না করেই সরিয়ে ফেলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে সেই একই ঔষধ অন্য রোগীর কাছে বিক্রি বা নিজস্ব ফার্মেসিতে ফেরত দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু চক্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ দফা নির্দেশনার ১০ নম্বর ধারায় ‘অপারেশন থিয়েটার এটিকুয়েট’ বা ওটি শিষ্টাচার মেনে চলার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এটি তার চরম লঙ্ঘন। এছাড়াও আছে ভুয়া চিকিৎসকের দাপট!
ভুক্তভোগীদের এমন অভিযোগ যে কতটা ভয়াবহ, তার প্রমাণ মেলে বানিয়াচং থেকে আসা এক প্রসূতির কথায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য তিনি ‘খোয়াই জেনারেল হাসপাতালে’ ভর্তি হন। তিন দিন তাকে রাখা হলেও এবং ১০ হাজার টাকা সিট বিল নিলেও হাসপাতালের পক্ষ থেকে সামান্যতম ওষুধ দেওয়া হয়নি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, *”পেট কাইট্ট্যা বাচ্চা হওয়ার পর আর ডাক্তার খুঁজে পাই নাই। বাইরের ডাক্তার আইনা আলাদা ভিজিটে চিকিৎসা করাইতে হইছে। অবহেলার কারণে আমার সেলাইয়ে ইনফেকশন পর্যন্ত হয়া গ্যাছিল।”
একইভাবে চুক্তির নামে প্রতারণার শিকার হয়েছেন চুনারুঘাট থেকে আসা অন্য এক রোগীর স্বজন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “১০ হাজার টাকার চুক্তিতে সিজার করাইতে ভর্তি করাইছিলাম। অথচ অপারেশনের পর বাইরে থাইকা কেনা ওষুধের বড় অংশই ওটি থাইকা মাইরা দিছে। তিন দিন পর রোগী ছুটি দেওয়ার সময় আমাগো হাতে হঠাৎ কইরা ৬-৭ হাজার টাকার ওষুধের এক বিশাল ফর্দ ধরায়া দেয়! এর ওপর বাচ্চার অবস্থা খারাপ হইলেও কোনো বড় ডাক্তারের দেখা পাই নাই, খালি কেবিনের ভাড়ার লাইগা চাপ দিছে। বাধ্য হয়া অতিরিক্ত টাকা মিটাইয়া বাচ্চাটারে বাঁচাইতে অন্য হাসপাতালে নিয়া গ্যাছি।”
এদিকে আবাসন সুবিধার নামেও চলছে হরিলুট। ক্লিনিকগুলোতে এসি এবং নন-এসি কেবিনের ভাড়ার কোনো স্বীকৃত তালিকা নেই। শীতকালেও রোগীদের কাছ থেকে এসির চার্জ আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া অপারেশন শেষ হওয়ার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকারি নির্দেশনার ৬ ও ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে উপস্থিতি এবং বিএমডিসি সনদ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে ক্লিনিকগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে প্যারামেডিক্যাল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের দিয়ে। ৮ নম্বর নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ছাড়া অপারেশন করার নিয়ম না থাকলেও প্রায়ই অদক্ষ লোক দিয়ে অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হচ্ছে। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২ নম্বর নির্দেশনামতে নির্ধারিত তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগের বাধ্যবাধকতাও তোয়াক্কা করছে না অধিকাংশ ক্লিনিক।
অভিযোগের বিষয়ে উল্লেখিত প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালের একাধিক মালিকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কালনেত্র প্রতিবেদকের সাথে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে ক্লিনিকগুলোর অনিয়ম ও নির্দেশনার তোয়াক্কা না করার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সভাপতি আকতার হোসেন হামদু বলেন, “জনবল সংকট বা কিছু ক্লিনিকের গাফিলতিতে সেবার মান ও ভাড়ার ক্ষেত্রে কিছু বিচ্যুতি বা অনিয়ম যে ঘটছে না—তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে পুরো খাতকে ঢালাও অভিযোগ না তুলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম পাওয়া গেলে সিভিল সার্জন বা প্রশাসন আইনি ব্যবস্থা নিক, সমিতির এতে কোনো আপত্তি নেই। আমরাও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি।”
সার্বিক অনিয়ম, কেবিনের অতিরিক্ত ভাড়া এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ দফা বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন রত্নদীপ বিশ্বাস মুঠোফোনে জানান, “সরকারি হাসপাতালে কেবিন ভাড়া নির্দিষ্ট করা থাকে, কিন্তু প্রাইভেট কেবিনের ভাড়া নির্দিষ্ট করা না থাকলেও অস্বাভাবিক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি এমন অস্বাভাবিক ভাড়া নেওয়া হয়, তবে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডিজিএইচএস (DGHS)-এর ১০ দফা নির্দেশনা পালন ও তদারকি নিয়ে তিনি আরও বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে আমরা নিয়মিত ভিজিট ও তদারকি করছি। গত সপ্তাহেও আমরা পরিদর্শন করেছি। যাদের ত্রুটি বা ঘাটতি পাওয়া যাচ্ছে, তাদের সতর্ক করা ও চিঠি দেওয়া হচ্ছে। আর যাদের পক্ষে শর্তগুলো পূরণ করা একেবারেই সম্ভব নয়, তাদের লাইসেন্স বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”*
এদিকে ভুক্তভোগীদের দাবি, হবিগঞ্জের এই অপচিকিৎসা ও অর্থ লুটের সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে সিভিল সার্জন অফিস ও জেলা প্রশাসনকে যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। ঔষধ চুরির সিন্ডিকেট চিহ্নিত করা, প্রসূতি ও নবজাতক মৃত্যুতে জড়িত হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
দ.ক.২৬