1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
ক্ষমতার পালাবদল ও প্রতিষ্ঠান দখলের সংস্কৃতি: শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের নীরব সংকট- মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ নিজ অর্থে রাস্তা উন্নয়নে এগিয়ে এলেন চেয়ারম্যান প্রার্থী কায়সার ফকির শায়েস্তাগঞ্জে অবৈধ ফুটপাত উচ্ছেদে ভ্রাম্যমাণ অভিযান ও জরিমানা চুনারুঘাটের ঘনশ্যামপুর থেকে গাঁজা সহ তিন মাদক কারবারি আটক, পিকআপ জব্দ বানিয়াচংয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে এনসিপি নেতা লিটনসহ ২ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণবার্ষিকী আজ চুনারুঘাটে নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় জামাত নেতা সাজল বহিষ্কার তাজুল উলুম ইসলামিয়া মডেল মাদ্রাসায় সবক প্রদান ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত চুনারুঘাটে জুলাই দিবস প্রতিযোগিতায় অগ্রণী উচ্চ বিদ্যালয়ের জয় ও নিলয়ের অর্জন আসামপাড়া বাজারে রাস্তায় জমে থাকা পানিতে ক্রেতা ও ব্যবসায়িদের চরম ভোগান্তি

ক্ষমতার পালাবদল ও প্রতিষ্ঠান দখলের সংস্কৃতি: শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের নীরব সংকট- মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

রাষ্ট্রের ক্ষমতার পরিবর্তন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। জনগণের ভোটে কিংবা সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের এই স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যদি সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেও অস্থিরতা নেমে আসে, যদি যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্যই পদ পাওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই পরিবর্তন সমাজের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কারণ হয়ে ওঠে।

আমাদের সমাজে বহুদিন ধরেই একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরিবর্তনের পরপরই কিছু মানুষের পরিচয়, প্রভাব, আচরণ এবং অবস্থানেরও নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, সামাজিক সংগঠন কিংবা বিভিন্ন কমিটি—যেখানে কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে, সেখানে মুহূর্তের মধ্যে পদ-পদবির রদবদল শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তন কোনো স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই বা যোগ্যতার মূল্যায়নের মাধ্যমে হয় না। ফলে যোগ্য ও অভিজ্ঞ মানুষের পরিবর্তে এমন ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসেন, যাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বা দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো তার সুশাসন। আর সুশাসনের ভিত্তি হলো যোগ্য নেতৃত্ব। যখন এই ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়, তখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য নষ্ট হয়, ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পায় এবং প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। এর প্রভাব শুধু প্রশাসনিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না; সাধারণ মানুষও তার নেতিবাচক ফল ভোগ করে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একটি বিদ্যালয়, কলেজ বা মাদ্রাসা হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠনের নিরাপদ স্থান। কিন্তু যখন এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব গুরুত্ব পায়, তখন শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক শিক্ষক স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অযাচিত হস্তক্ষেপ, অপ্রয়োজনীয় চাপ কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের কারণে শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। ফলে শিক্ষা কার্যক্রমেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

একজন শিক্ষক সমাজ গড়ার কারিগর। তিনি যদি নিজের কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ, সম্মানিত ও স্বাধীন বোধ না করেন, তবে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ অনেক সময় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শিক্ষাবিদদের মতামতের চেয়ে কমিটির কিছু প্রভাবশালী সদস্যের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই বেশি গুরুত্ব পায়। এতে প্রতিষ্ঠানের সুস্থ পরিবেশ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, সাংগঠনিক অনুষ্ঠান কিংবা অন্যান্য কর্মসূচির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ব্যবহার করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। শিক্ষাঙ্গন এমন একটি স্থান, যেখানে শিক্ষার্থীরা মুক্তভাবে জ্ঞান অর্জন করবে, সৃজনশীল চিন্তা করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করবে। সেখানে যদি অন্য কোনো উদ্দেশ্য প্রাধান্য পায়, তবে শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর। এই বয়সে তারা সহজেই প্রভাবিত হয়। যদি তারা পড়াশোনার পরিবর্তে বিভিন্ন প্রলোভন, ক্ষমতার মোহ বা অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার দিকে আকৃষ্ট হয়, তবে তাদের ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। অনেকেই ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়, শৃঙ্খলা হারায় এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় জীবন অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যায়। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে?
একই চিত্র অনেক সময় ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও দেখা যায়। মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে যদি দক্ষতা, সততা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সেবা, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা।

এ কথা সত্য যে, সব কমিটি বা সব ব্যক্তি একই রকম নন। অনেক প্রতিষ্ঠানেই দক্ষ, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের অবদান সমাজের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এক কাতারে বিচার করা উচিত নয়। তবে যেখানে অযোগ্যতা ও প্রভাবের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে সমস্যার কথা নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা সমাজের দায়িত্ব।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং যোগ্যতাভিত্তিক ব্যবস্থা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিংবা অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের পরিচালনা কমিটিতে এমন মানুষকে দায়িত্ব দিতে হবে, যাদের সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিকতা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত থেকে নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষা, নৈতিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ওপর। যদি এসব প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়, তবে উন্নয়নের বড় বড় পরিকল্পনাও টেকসই হবে না। ক্ষমতা পরিবর্তন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি সমাজের প্রতিটি স্তরে অস্থিরতা, অযোগ্যতার বিস্তার এবং প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তবে তা কখনোই একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ নয়।

আজ সময় এসেছে ব্যক্তি নয়, যোগ্যতাকে মূল্য দেওয়ার; প্রভাব নয়, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার; এবং দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠান হিসেবেই সম্মান করার। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, হাসপাতাল কিংবা সামাজিক সংগঠন কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়—এগুলো একটি জাতির বিবেক, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। সেই ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, ততই সমাজ হবে সুশৃঙ্খল, মানবিক ও সমৃদ্ধ।

লেখক~কবি কলামিস্ট ও সাংবাদিক

দ.ক/এমআরএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews