
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো কখনো এমন কিছু দৃশ্য চোখে পড়ে, যা শুধু মন খারাপই করে না, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ নিয়েও গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে এক বৃদ্ধা মায়ের করুণ পরিণতির সংবাদ ও ছবি দেখে অসংখ্য মানুষের মতো আমিও স্তব্ধ হয়ে গেছি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন ৭৫ বছর বয়সী মায়ের এমন অসহায় ও নিঃসঙ্গ অবস্থার কথা ভাবলেই হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
একজন মা তার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করেন, তার কোনো হিসাব নেই। গর্ভধারণের কষ্ট, সন্তান জন্মদানের যন্ত্রণা, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটানো, নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সংগ্রাম—এসবই একজন মায়ের জীবনের স্বাভাবিক অধ্যায়। সন্তানের সামান্য অসুস্থতায় যে মা নিজের ঘুম, ক্ষুধা, আরাম সবকিছু ভুলে যান, সেই মায়ের বার্ধক্যে সন্তানের দায়িত্ব কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে?
সমাজে প্রায়ই শোনা যায়, শাশুড়ি-বউমার সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প। পারিবারিক অশান্তি বা মানসিক দূরত্বের কারণে অনেক সময় সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কিন্তু একজন মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কি কখনো অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল হতে পারে? একজন ছেলে বা মেয়ে তার জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি যে নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক দায় বহন করে, তা কোনো পরিস্থিতিতেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ বারবার পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের কথা বলে এসেছে।
কবির ভাষায়—
“মা যে আমায় ঘুম পাড়াতো
দোলনা ঠেলে ঠেলে,
শীতল হতো প্রাণটা মায়ের
হাতটা বুকে পেলে।”
এই কয়েকটি পংক্তিতেই ফুটে উঠেছে সন্তানের জীবনে মায়ের অপরিসীম অবদান। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্ম ও দর্শনেই মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত। ইতিহাসে বায়েজিদ বোস্তামির মাতৃভক্তির কাহিনি যেমন মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধা জাগায়, তেমনি অসংখ্য মনীষীর জীবনেও আমরা পিতা-মাতার প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের উদাহরণ দেখতে পাই।
প্রশ্ন হলো, আধুনিক শিক্ষা, উচ্চপদ, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা কি মানুষের মানবিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করতে পারে? একজন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সচিব, কর্মকর্তা কিংবা ব্যবসায়ী হতে পারেন; কিন্তু যদি তিনি নিজের অসহায় মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার সাফল্যের অর্থ কী? সমাজে সম্মান পাওয়ার আগে কি পরিবারে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা প্রয়োজন নয়? তবে এ ধরনের ঘটনায় আবেগের পাশাপাশি সতর্কতাও প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের সবকিছু যাচাই-বাছাই ছাড়া সত্য ধরে নেওয়া সমীচীন নয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ, পারিবারিক বাস্তবতা কিংবা আইনি দিকগুলো তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া উচিত। কারণ ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত হলো সত্য উদঘাটন।
কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য—যদি কোনো সন্তান সচেতনভাবে তার বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করে, তাদের প্রয়োজনীয় সেবা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তাহলে তা শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধেরও পরাজয়। এমন ঘটনা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার জন্য আইন রয়েছে। সেই আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও পারিবারিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ আইন শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু মানবিকতা সৃষ্টি করতে পারে না। মানবিকতা গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা ও নৈতিক চর্চার মাধ্যমে।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। আমরা কি আমাদের বয়স্ক মা-বাবার খোঁজ নিচ্ছি? তাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি? তাদের একাকীত্ব, শারীরিক দুর্বলতা ও মানসিক চাহিদা বোঝার চেষ্টা করছি? নাকি ব্যস্ততার অজুহাতে ধীরে ধীরে তাদের জীবনের প্রান্তসীমায় ঠেলে দিচ্ছি?
একজন মা-বাবা সন্তানের কাছে কখনো বিলাসিতা চান না। তারা চান একটু খোঁজখবর, কিছু আন্তরিকতা, কয়েকটি ভালোবাসার কথা এবং বিপদের সময় পাশে থাকার আশ্বাস। জীবনের শেষ বয়সে এটুকুই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
পল্লবীর এই মর্মান্তিক ঘটনা সত্যিই যদি অবহেলার ফল হয়ে থাকে, তবে তা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। কারণ যে সমাজে মা-বাবার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তিও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আসুন, আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি—আমাদের মা-বাবা যেন কখনো একাকীত্ব, অবহেলা কিংবা অসহায়ত্বের শিকার না হন। কারণ পৃথিবীতে অনেক সম্পর্কের বিকল্প পাওয়া যায়, কিন্তু একজন মায়ের বিকল্প কখনো সৃষ্টি হয় না।
লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট
দ.ক.২৬