
বিজ্ঞান ডেস্ক, কালনেত্র: একটি নতুন গবেষণা অনুযায়ী, গরু, ভেড়া এবং ছাগলের পাকস্থলির একটি বিশেষ প্রকোষ্ঠে বসবাসকারী নির্দিষ্ট কিছু অণুজীবের ভেতরে ‘হাইড্রোজেনোবডি’ নামে একটি অঙ্গাণু পাওয়া গেছে। গরু প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস ঢেকুর তোলার জন্য পরিচিত। এই মিথেন একটি তাপ-ধারণকারী গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
মাত্র এক বছরে একটি গরু প্রায় ২শ ২০ পাউন্ড (প্রায় ১০০ কেজি) মিথেন গ্যাস নির্গত করতে পারে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রিনহাউস গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেন গ্যাস ২৮ গুণ বেশি শক্তিশালী।
বিজ্ঞানীরা এখন সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন, কেন গরু এবং অন্যান্য গবাদি পশু এত বেশি মিথেন তৈরি করে। তারা বলছেন,এর জন্য দায়ী গুরু ও অন্যান্য গবাদি পশুর অন্ত্রের অণুজীবের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি ইতোপূর্বে অজানা একটি কোষীয় কাঠামো।
৩০ এপ্রিল (২০২৬) ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত এই ফলাফলগুলো মিথেন নির্গমন কমানোর নতুন কৌশল উদ্ভাবনের আশা জাগিয়েছে।
পাকস্থলির রুমেন প্রকোষ্ঠ
গরু এবং সেইসঙ্গে ভেড়া ও ছাগলের মতো আরো কিছু প্রাণীর পাকস্থলিতে ‘রুমেন’ নামে একটি বিশেষ প্রকোষ্ঠ বা অংশ থাকে। এই রোমন্থক (জাবর কাটা) প্রাণীদের লালন-পালন সংক্রান্ত কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম মানুষের কারণে সৃষ্ট মিথেন নিঃসরণের প্রায় ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী।
একটি গরুর রুমেনে লাখ লাখ অণুজীব বাস করে, যা এই প্রাণীদের এমন সব খাবার হজম করতে সাহায্য করে, যা তারা নিজে নিজে হজম করতে পারে না।
গবেষকেরা অনেকদিন ধরেই সন্দেহ করে আসছিলেন যে, ‘রুমেন সিলিয়েটস’ নামে একদল অণুজীব মিথেন তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় তারা ঠিক কীভাবে অবদান রাখে, তা এতদিন খুব একটা স্পষ্ট ছিল না।
চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের হাইড্রোবায়োলজিস্ট এবং এই গবেষণার সহলেখক ওয়েই মিয়াও ‘নেচার’ সাময়িকীর মিরিয়াম নাদাফকে জানান, এর আংশিক কারণ হলো- এই ক্ষুদ্র অণুজীবগুলো নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত কঠিন।
তিনি ব্যাখ্যা করে জানান, অন্য সব অণুজীবের সংমিশ্রণ বা দূষণ ছাড়াই এদের ডিএনএ আলাদা করে বিশ্লেষণ করা বেশ দুঃসাধ্য একটি কাজ।
মিয়াও এবং তাঁর সহকর্মীরা গরু, ভেড়া, ছাগল ও হরিণের পাকস্থলিতে (রুমেন) বসবাসকারী ৪শ ৫০টি সিলিয়েট-এর ডিএনএ বা জিনোমের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির মাধ্যমে এই গবেষণার ঘাটতি পূরণ করেছেন। তাঁদের এই বিশ্লেষণে ৬৫টি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫টির জিনোম এর আগে কখনোই পরীক্ষা করা হয়নি।
এরপর গবেষকেরা ১০০টি দুগ্ধবতী গাভীর পাকস্থলির অণুজীব এবং মিথেন নিঃসরণের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানে তাঁরা কিছু সম্পর্ক খুঁজে পান। যেমন- একটি প্রাণীর শরীরে সিলিয়েটের সংখ্যা যত বেশি, সেখানে মিথেন উৎপাদনকারী অণুজীবের উপস্থিতিও তত বেশি এবং প্রাণীটি তত বেশি গ্যাস নির্গত করে। ভেড়ার ক্ষেত্রে ‘ডাসিট্রিচা’ নামে একটি সিলিয়েট প্রজাতি বিশেষভাবে নজরে আসে।
গবেষকেরা দেখেছেন যে, একই ধরনের খাবার খাওয়া সত্ত্বেও যেসব ভেড়া উচ্চ মাত্রায় মিথেন উৎপন্ন করে, তাদের শরীরে কম মিথেন উৎপন্নকারী ভেড়ার তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি ডাসিট্রিচা রয়েছে।
যখন গবেষক দলটি এই ডাসিট্রিচা কোষগুলো পরীক্ষা করেন, তখন তাঁরা ‘হাইড্রোজেনোবডি’ নামে একটি কাঠামোর সন্ধান পান। এটি হাইড্রোজেন তৈরি করে, যা পরবর্তীতে রুমেনের অন্যান্য অণুজীবের সঙ্গে বিক্রিয়া করে মিথেন উৎপন্ন করে।
এই গবেষণার সহলেখক এবং চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের জীববিজ্ঞানী জিয়ে জিওং-কে সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর জ্যাকি ফ্লিন মোগেনসেনকে বলেন, ‘এই গঠনটি কোষীয় জীববিজ্ঞানের সঙ্গে মিথেন নিঃসরণকে কত স্পষ্টভাবে যুক্ত করে, তা দেখে আমরা কিছুটা অবাক হয়েছিলাম!’
গবেষক দলটি দেখেছেন যে, রুমেন সিলিয়েট (এক ধরনের অণুজীব) এর বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এই নতুন আবিষ্কৃত কাঠামোর সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, ডাসিট্রিচা কোষগুলোতে এনটোডিনিয়াম গণের কোষের তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ বেশি ‘হাইড্রোজেনোবডি’ থাকে। উল্লেখ্য যে, এনটোডিনিয়াম অন্য গ্রুপের তুলনায় কম মিথেন তৈরি করে।
গবেষকেরা এর আগে অণুজীবের মধ্যে ‘হাইড্রোজেনোজোম’ নামে আরেকটি হাইড্রোজেন উৎপাদনকারী কাঠামোর কথা জানতেন।
এটি শক্তি উৎপাদনকারী অঙ্গাণু ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’র সঙ্গে সম্পর্কিত এবং উভয়েরই দুটি করে আবরণ বা মেমব্রেন থাকে। কিন্তু নতুন পাওয়া এই ‘হাইড্রোজেনোবডি’র আবরণ মাত্র একটি; যার অর্থ হতে পারে, যে এদের বিবর্তনীয় উৎস ভিন্ন। এই গবেষণার ফলাফলগুলো গরু কীভাবে মিথেন উৎপাদন করে, সেই প্রক্রিয়ার পেছনে থাকা রহস্য উন্মোচনে একটি কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডেভিসের প্রাণিবিজ্ঞানী এরমিয়াস কেব্রেয়াব, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
যদিও এই আবিষ্কারটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, খামারিরা চাইলে তাদের গবাদি পশুর পাকস্থলি থেকে নির্দিষ্ট কিছু ‘সিলিয়েট’ (এক প্রকার অণুজীব) নির্মূল করার চেষ্টা করতে পারেন, তবে ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার অণুজীববিজ্ঞানী এবং গবাদি পশু পুষ্টিবিদ টড ক্যালাওয়ে সায়েন্স নিউজ-এর টিনা হেসমান সায়েকে জানান যে, কাজটি বলা যতটা সহজ, করা ততটাই কঠিন।
তিনি উল্লেখ করেন, এটি করতে হলে প্রাণীগুলোকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে, জীবাণুমু%