
রোকনুজ্জামান শরীফ: মানুষের মুখের হাসি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি সুস্বাস্থ্যেরও প্রতিফলন। কিন্তু সেই হাসি যদি হয়ে ওঠে যন্ত্রণা, ভয় এবং প্রতারণার গল্প—তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক উদ্বেগেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে দাঁতের অপচিকিৎসা এবং ভুয়া দন্ত চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য আজ এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে মানুষের শরীর, মন এবং অর্থনীতির ওপর।
দাঁতের চিকিৎসা সাধারণত আমরা ছোটখাটো সমস্যা ভেবে অবহেলা করি। কিন্তু ভুল চিকিৎসা বা অপচিকিৎসা এই ছোট সমস্যাকেই বড় বিপদে পরিণত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভুলভাবে করা রুট ক্যানেল বা ফিলিংয়ের কারণে রোগী দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও অস্বস্তিতে ভোগেন। একটি দাঁতের সমস্যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পাশের দাঁতেও, মাড়িতে সংক্রমণ তৈরি হয়, এমনকি সুস্থ দাঁতও নড়ে যেতে পারে। এক পর্যায়ে দাঁত হারানোর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়।
অপচিকিৎসার আরেকটি গুরুতর দিক হলো সংক্রমণ। জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করলে দাঁতের মূলে বা মাড়িতে ইনফেকশন বা ফোড়া (Abscess) তৈরি হতে পারে। আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—এই সংক্রমণ শুধু মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; রক্তের মাধ্যমে তা শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি কিংবা এইডসের মতো মারাত্মক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও থেকে যায়, যদি ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না করা হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও প্রকট।
বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, দেশের অনেক ডেন্টাল চেম্বারে এখনও সঠিক sterilization বা জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়া মানা হয় না। ফলে একজন সুস্থ রোগী চিকিৎসা নিতে গিয়ে নতুন রোগ নিয়ে ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে।
এই সংকটের মূল কারণগুলোর একটি হলো ভুয়া দাঁতের ডাক্তারদের বিস্তার।
দেশে এমন অসংখ্য ব্যক্তি আছেন, যারা প্রয়োজনীয় ডিগ্রি বা নিবন্ধন ছাড়াই “ডেন্টিস্ট” পরিচয়ে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই কারিগরি শিক্ষার আংশিক জ্ঞান বা ভুয়া সনদের ওপর ভিত্তি করে চেম্বার খুলে বসেন। অথচ প্রকৃত অর্থে দন্ত চিকিৎসক হতে হলে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক।
ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তাদের পরিধির ১০টি কাজসহ দন্ত চিকিৎসকদের সহকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা নিজেরাই চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখছেন, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং বিপজ্জনক। সাধারণ মানুষ এ পার্থক্য বুঝতে না পেরে প্রতারিত হচ্ছেন।
অপচিকিৎসার ফলে শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, মানসিক চাপও বাড়ে। দীর্ঘদিনের ব্যথা, চিকিৎসার ব্যর্থতা এবং নতুন করে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন—সব মিলিয়ে রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতিও দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। একবার ভুল চিকিৎসার খেসারত দিতে গিয়ে অনেককে আবার নতুন করে চিকিৎসা শুরু করতে হয়, যা অনেকের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতিও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ভুয়া চিকিৎসক বছরের পর বছর প্রকাশ্যে চেম্বার চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়। কখনো জেল-জরিমানা হলেও তারা আবার আগের মতোই কার্যক্রম শুরু করে। এতে বোঝা যায়, কেবল অভিযান নয়, টেকসই নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে।
প্রথমত,সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। দাঁতের চিকিৎসা নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের ডিগ্রি ও নিবন্ধন নম্বর যাচাই করা উচিত। একজন যোগ্য দন্ত চিকিৎসকের (BDS, FCPS/MS/PhD) কাছেই চিকিৎসা নেওয়া নিরাপদ। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যখাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নিয়মিত মনিটরিং এবং অবৈধ চেম্বারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
তৃতীয়ত, ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোতে জীবাণুমুক্তকরণের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সবশেষে বলা যায়, একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে শুধু উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাই নয়, সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দাঁতের চিকিৎসা কোনো সাধারণ বিষয় নয়—এটি সরাসরি মানুষের জীবনমানের সঙ্গে জড়িত। তাই আমাদের সবারই দায়িত্ব—সচেতন হওয়া, অন্যকে সচেতন করা এবং ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
হাসি যেন সত্যিকারের আনন্দের প্রতীক হয়—ভয় আর প্রতারণার নয়।
দ.ক.সিআর.২৬