
নিপুণ চন্দ্র : ঢাকার আসাদগেট, চট্টগ্রামের নিউমার্কেট বা সিলেটের আম্বরখানা—সর্বত্র একই দৃশ্য। সকাল থেকে দীর্ঘ লাইন, গাড়ি ঠেলে নিয়ে আসা চালক, পাম্পে সীমিত বিক্রয়ের ঘোষণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “সব শেষ হয়ে যাচ্ছে” ধরনের পোস্ট। অথচ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বারবার বলছে—দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। মে মাস পর্যন্ত মজুত নিশ্চিত, অতিরিক্ত আমদানি চলছে এবং দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা শক্তিশালী। তাহলে এই হাহাকার কেন? বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি কৃত্রিম সংকট—ইরান যুদ্ধের খবর, আতঙ্ক এবং একটি বিশেষ মহলের পাকিস্তানের চলমান জ্বালানি সংকট নিয়মিত অনুসরণ করে মজুত করার চেষ্টার ফল। ফলে সামান্য আমদানি নির্ভরতাও বেড়ে যাচ্ছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে।
ফাইন্যান্সিয়াল ইয়ার ২০২৪-২৫-এ (জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫) বাংলাদেশে মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের বিক্রয় (চাহিদা ধরে) ছিল ৬৮.৩৫ লাখ টন—গত বছরের তুলনায় মাত্র ১.০৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি—৪৩.৫০ লাখ টন (দৈনিক গড় প্রায় ১২,০০০ টন)। এটি কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূল ভূমিকা পালন করে। পেট্রোলের (মোটর স্পিরিট বা এমএস) বার্ষিক চাহিদা ৪,৬২,০০০ টন (দৈনিক গড় প্রায় ১,২৬৭ টন)। অকটেনের (এইচওবিসি) চাহিদা ৪,১৫,০০০ টন (দৈনিক গড় প্রায় ১,১৩৬ টন)—গত পাঁচ বছরে যা ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন (দৈনিক ৪,০০০-৪,২০০ টন), যা গৃহস্থালি ও শিল্পে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু এই চাহিদার বড় অংশই দেশীয় উৎপাদন দিয়ে মেটানো সম্ভব। পেট্রোলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ—১০০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন সম্ভব এবং আমদানির প্রয়োজন হয় না। অকটেনের প্রায় ৪৮ শতাংশ (প্রায় ২,০০,০০০ টন) দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ডিজেলের প্রায় ৪৫ শতাংশ (১৯-২০ লাখ টন) দেশীয় রিফাইনারি থেকে আসে। এলপিজির ক্ষেত্রে অবশ্য আমদানি নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৯৮ শতাংশ। মোট নিজস্ব উৎপাদন (দেশীয় কনডেনসেট ও আমদানিকৃত ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করে) প্রায় ১৯.৩৬ লাখ টন, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৮ শতাংশ। বাকিটা আমদানি করা হয়, কিন্তু সেটা স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া—কোনো সংকটের লক্ষণ নয়।
দেশীয় উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো সিলেট বিভাগের গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট (গ্যাসের উপ-পণ্য)। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)-এর দুটি প্রধান প্ল্যান্ট—রশিদপুর (হবিগঞ্জ) এবং কৈলাশটিলা-হরিপুর (সিলেট)—এখান থেকে উৎপাদন হয়। এই দুটি প্ল্যান্ট ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে ১,১৬,৬৬২ টন পেট্রোল এবং ৫৫,৩৩৯ টন অকটেন উৎপাদন করেছে। দৈনিক সক্ষমতা ৭,৫০০ ব্যারেল কনডেনসেট হলেও বর্তমানে গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমায় প্রায় ৪,০০০+ ব্যারেল প্রক্রিয়াজাত হয়। এতে পেট্রোলের চাহিদার ৩৩-৩৫ শতাংশ এবং অকটেনের ৭-৮ শতাংশ মেটানো সম্ভব। এছাড়া সামান্য পরিমাণ ডিজেল, কেরোসিন ও এলপিজিও উৎপাদিত হয়। কনডেনসেট আসে বিবিয়ানা, জালালাবাদ, রশিদপুর, কৈলাশটিলা ইত্যাদি গ্যাসক্ষেত্র থেকে—আশুগঞ্জ টার্মিনাল হয়ে প্ল্যান্টে পৌঁছায়।
চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) হলো দেশের একমাত্র বড় সরকারি রিফাইনারি। নর্থ পাতেঙ্গায় অবস্থিত এই প্ল্যান্ট আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল এবং কিছু কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইআরএল রেকর্ড ১.৫৩৫ মিলিয়ন টন ক্রুড প্রসেস করেছে (বার্ষিক সক্ষমতা ১.৫ মিলিয়ন টন)। এখান থেকে পেট্রোল ও ডিজেলের বড় অংশ আসে—অকটেন উৎপাদন হয় না। দৈনিক ক্রুড প্রসেসিং ক্ষমতা প্রায় ৪,৫০০ টন। এছাড়া চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে চারটি বেসরকারি রিফাইনারি ও ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট (সুপার রিফাইনারি, পেট্রোম্যাক্স, সিভিও ইত্যাদি) দেশীয় ও আমদানিকৃত কনডেনসেট থেকে পেট্রোল ও অকটেনের বাকি অংশ উৎপাদন করে। এদের মোট উৎপাদন মাসিক প্রায় ৩০,০০০+ টন (বিস্তারিত পাবলিক তথ্য সীমিত)।
এই উৎপাদন কাঠামো দেখলে স্পষ্ট যে পেট্রোল-অকটেনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে এসজিএফএলের এলপিজি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জীবন শান্তি সরকার বলেছেন, “দেশীয় কনডেনসেট থেকে পেট্রোলের চাহিদার ৪০-৪৫ শতাংশ এবং অকটেনের একটি বড় অংশ পূরণ হচ্ছে। ফিনিশড পেট্রোল আমদানির প্রয়োজন হয় না।” তবুও হাহাকার কেন? কারণ একটি মহল দেশের খবরা খবরের চেয়ে বিদেশী খবর যেমন- পাকিস্তানের চলমান পরিস্থিতি নিয়মিত ফলো করছে। পাকিস্তানে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পেট্রোলের দাম ৪২.৭ শতাংশ বেড়ে ৪৫৮.৪০ রুপি এবং ডিজেল ৫৪.৯ শতাংশ বেড়ে ৫২০.৩৫ রুপি হয়েছে। সেখানে স্কুল-কলেজ বন্ধ, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, জ্বালানি রেশনিং চলছে। বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী ও গ্রাহক এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে মজুত করছেন। একটি মহল ইচ্ছাকৃত অবৈধভাবে জ্বালানী মজুত করে সরকারকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করছে অব্যাহতভাবে। ফলে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি কেনাকাটা হচ্ছে। পাম্প মালিকরা বলছেন, আগে ৫-৬ হাজার লিটার বিক্রি হতো, এখন ২০-৩০ হাজার লিটার। এটাই কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেছেন, “এটা প্যানিক পারচেজ। কনডেনসেট উৎপাদন কিছুটা কমলেও আমরা স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে পারব। অকটেনের জন্য অতিরিক্ত আমদানি আসছে।” সরকারও একই কথা বলছে। জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, “মজুতের কোনো অসুবিধা নেই। আমরা সিঙ্গাপুর থেকে বেশি দামে তেল এনে স্টক করছি। মে মাস পর্যন্ত চলবে।” দৈনিক ১৬০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, ভ্রাম্যমাণ আদালত, কিউআর কোড (মোটরসাইকেলের জন্য), জোড়-বেজোড় ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অবৈধ মজুত উদ্ধারে অভিযান চলছে।
তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে? বিবিসি প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে—পেট্রোল-অকটেনের দিক থেকে জ্বালানিশূন্য হওয়ার আশঙ্কা নেই। শুধু এসজিএফএলের দেশীয় কনডেনসেট থেকে পেট্রোলের প্রায় ২৫ শতাংশ (১.১৭ লাখ টন/বছর) এবং অকটেনের ১৩ শতাংশ (৫৫ হাজার টন) চলবে। ইআরএল ও বেসরকারি প্ল্যান্ট বন্ধ হলেও এসজিএফএল চালু থাকবে। করণীয় হিসেবে রেশনিং, অগ্রাধিকার বিতরণ (জরুরি যানবাহন, কৃষি, বিদ্যুৎকেন্দ্র), মজুত সংরক্ষণ, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি (গ্যাসক্ষেত্রে ওয়ার্কওভার, প্ল্যান্ট সাতদিন চালু), বিকল্প জ্বালানি (সিএনজি, ইলেকট্রিক যান) এবং দীর্ঘমেয়াদে পায়রা রিফাইনারি চালু, ইআরএল আধুনিকায়ন (৪.৫ মিলিয়ন টন ক্ষমতা) ও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান জরুরি।
এই হাহাকারের মূলে রয়েছে আচরণগত সমস্যা। যার আগে ২ লিটার দরকার ছিল, সে এখন ২০ লিটার কিনছে। এতে পাম্প খালি হয়ে যাচ্ছে, লাইন লাগছে—যদিও মোট সরবরাহ ঠিক আছে। পাকিস্তানের দৃশ্য দেখে কিছু মহল মজুত করে সামান্য আমদানি নির্ভরতা বাড়িয়ে তুলছে, যা অপ্রয়োজনীয়। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি চলছে—অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান, জরিমানা ও কারাদণ্ড। বৈশ্বিক চলমান পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল জনগনমাত্র সরকারকে সহযোগীতা করা ও সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার দরকার। জনগণ যদি সাশ্রয়ী হয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত না কেনে, তাহলে ২-৩ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে দেশীয় উৎপাদনের এই শক্তি আছে যে ইরান যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকটেও পেট্রোল-অকটেনে আমরা টিকে থাকতে পারি। শুধু আতঙ্ক আর মজুতদারির মানসিকতা ত্যাগ করলেই হবে। সরকারি তথ্য অনুসারে সাপ্লাই লাইন অটুট। পাকিস্তানের মতো দাম বাড়েনি, ভর্তুকি চলছে। তাই আসুন, তথ্যের ভিত্তিতে শান্ত থাকি। হাহাকার নয়, সচেতনতাই সমাধান।
দ.ক.সিআর.২৬