
কালনেত্র প্রতিবেদন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সারা দেশে সাইবার অপরাধের মামলার বেশিরভাগই বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায়। এ ছাড়া ফেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা, মিথ্যা প্রচারণা ছড়ানো, ফেসবুক বা ওয়েবসাইট হ্যাকিং, অনলাইন জুয়া, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা, ভিডিও বা ছবি ছড়িয়ে প্রতারণার ঘটনায়ও মামলা রয়েছে। তবে জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে নতুন সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে রাশ টেনে ধরতে পারছে না পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ট্র্যাডিশনাল অপরাধেও (হত্যা, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, মাদক, অস্ত্র ব্যবসা ও অপহরণ) এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার হচ্ছে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পেশাদার অপরাধীরা ঝুঁকছে সাইবারকেন্দ্রিক অপরাধের দিকে। এরা মোবাইল ফোনে কোনো ধরনের সিম ব্যবহার করে না। টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে টাকাপয়সা হাতিয়ে নেওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এ কারণে মামলা বা অভিযোগ হলেও অনেক সময় আসামি গ্রেপ্তারে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) রেজাউল মাসুদ বলেন, ‘ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম, পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক এবং ওয়েবসাইট হ্যাকড ও প্রতারণা এ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ হচ্ছে। আগে সাইবারকেন্দ্রিক সব অপরাধ আমলযোগ্য হিসেবে থানায় মামলা করার সুযোগ ছিল এবং সেক্ষেত্রে পুলিশের কাজও বেশি ছিল। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তন এনে সাইবার নিরাপত্তা আইনে চারটি ধারায় আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে থানায় মামলা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্য সব ধারার অপরাধ অ-আমলযোগ্য। অ-আমলযোগ্য অপরাধের ধারায় পড়লে থানায় মামলা নেওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হবে।’
পুলিশের এক প্রতিবেদন বলছে, সাইবার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনলাইনে চকটদার বিজ্ঞাপন দিয়ে অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, এমএলএম ব্যবসা, আর্থিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবসা চালাচ্ছে। এ ছাড়া জুয়ার সাইট, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা, পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক ও ওয়েবসাইট হ্যাকিং, মানহানিকর বক্তব্য প্রচারের মাধ্যমেও অনেক ভুক্তভোগীকে হয়রানি করা হচ্ছে। দেশি সাইবার অপরাধ চক্রের পাশাপাশি বিদেশি চক্রের মাধ্যমেও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। তবে বেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রে থানায় মামলা হচ্ছে না। এসব ঘটনা প্রকাশ করতে চান না ভুক্তভোগীরা।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার ইউনিটের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ফেসবুক ও অন্যান্য ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের ঘটনা ছিল মোট সাইবার অপরাধের ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ২০২১ সালে বেড়ে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে। একই অপরাধ ২০২২ সালে আগের অবস্থানে এলেও ২০২৩ সালে বেড়ে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে পর্নোগ্রাফি ধারণ ও অনলাইনে হ্যারাসমেন্টের মতো অপরাধ ২০২০ সালে ১৯ দশমিক ০৪ শতাংশ হলেও এ ধরনের অপরাধ ২০২২ সালে ২০ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে তা বেড়ে ২৪ দশমিক ৭০ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি বছরের গত দুই মাসে এ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে, মোবাইল ব্যাংকিং-সংক্রান্ত প্রতারণা ২০২০ সালে ১৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ থাকলেও ২০২১ সালে ২৪ শতাংশের বেশি ছিল। অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে ২০২০ সালে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ, ২০২১ সালে ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ, ২০২২ সালে ২৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৪২ দশমিক ৩৫ শতংশ। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এ অপরাধের সংখ্যা ৫৩ শতাংশের বেশি।
সাইবার অপরাধের ঘটনা পর্যালোচনা করে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) ২০২৩ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, গত আট বছরের (২০১৫ থেকে ২০২২) সাইবার অপরাধের জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে নতুন ধরনের সাইবার অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে মানুষ। অ্যাপের মাধ্যমে ঋণের নামে ফাঁদের মতো অভিনব পদ্ধতিতে নানা ধরনের আর্থিক অপরাধের প্রবণতা বাড়লেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, অন্যান্য বিভাগের তুলনায় ঢাকা বিভাগে প্রায় সব ধরনের সাইবার অপরাধের চিত্র তুলনামূলকভাবে বেশি আশঙ্কাজনক। ঢাকা বিভাগে সাইবার অপরাধের শতকরা হার প্রায় সবক্ষেত্রেই শীর্ষস্থানে। এসব অপরাধের মধ্যেও যে সাইবার অপরাধ সবচেয়ে বেশি সে রকম তিনটি হলো অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার (১০.২২%), অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি (১০.২২%), ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের আইডি হ্যাকিং (১০.২২%)। ঢাকার পর দ্বিতীয় শীর্ষ সাইবার অপরাধপ্রবণ বিভাগের স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বয়সভিত্তিক বিবেচনায় ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই ফেসবুক হ্যাকিং বা বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। শিশু ও কিশোররা সাইবার অপরাধের শিকার বেশি হচ্ছে।
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষণকারীরা বলছেন, ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ এবং অনলাইন পরিষেবার প্রসারের ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও সাইবার হুমকি এবং আক্রমণের জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ সরকার সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব স্বীকার করে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আইনি কাঠামো বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা নীতি প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল সম্পদ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগতির জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
দ.ক.সিআর.২৬