
কালনেত্র : চুনারুঘাটের রাজার বাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় যেন এক আলোকোজ্জ্বল আনন্দলোক। ক্রীড়া, সংস্কৃতি, শৃঙ্খলা ও সৃজনশীলতার মিলনে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ২০২৬।
সবাই মিলে খেলা করি, সুস্থ একটা সমাজ গড়ি”—এই প্রত্যয়কে ধারণ করে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অতিথিদের জন্য হয়ে ওঠে স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা।
শতবর্ষীয় ঐতিহ্যের ধারক রাজার বাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বর্তমানে প্রায় ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, ঐক্য ও সাংস্কৃতিক চেতনার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হিসেবে ফুটে ওঠে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিক্ষা কর্মকর্তা। সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। অতিথিদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মর্যাদা ও গুরুত্বকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নৈতিক চেতনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় পুরো মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশপ্রেমের আবেগ ও গর্বের অনুরণন। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে দেয় গভীর অনুভূতির ছাপ।
এই আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সঞ্চালকের সাবলীল ও পরিমিত উপস্থাপনা। তাঁদের প্রাঞ্জল ভাষা, শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিচালনা ও আবেগময় উপস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত, গতিশীল ও মনোগ্রাহী। প্রতিটি পর্বের সেতুবন্ধন রচনা করে তাঁরা অনুষ্ঠানের ছন্দ ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ে বালিকা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্ত উপস্থিতি ছিল দর্শনীয়। এক হাজার মিটার দৌড়, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও দলগত নৃত্যে তারা যে দৃঢ়তা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তা নারী ক্ষমতায়ন ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের এক অনুপ্রেরণামূলক বার্তা বহন করে। শিশু শিক্ষার্থীদের উদ্বোধনী নৃত্য ও ছোটদের অংশগ্রহণ পুরো পরিবেশকে করে তোলে আরও আনন্দঘন ও আবেগপূর্ণ।
মার্চ পাস্ট, ক্রীড়া শপথ পাঠ ও পিটি প্যারেডে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, ঐক্য ও নেতৃত্বগুণের পরিচয় ফুটে ওঠে। প্যারেড কমান্ডারের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের সুশৃঙ্খল অগ্রযাত্রা দর্শকদের মুগ্ধ করে। মাঠজুড়ে প্রতিটি পদচারণায় যেন প্রতিফলিত হচ্ছিল আত্মবিশ্বাস, সাহস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
মশাল দৌড় ও দীপশিখা প্রজ্জ্বলনের পর্বটি ছিল অনুষ্ঠানের এক আবেগঘন মুহূর্ত। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোঃ মানজারুল ইসলামের হাতে মশাল পরিক্রমণ খেলোয়াড়দের মনোবল জাগিয়ে তোলে এবং প্রতিযোগিতার প্রতীকী তাৎপর্যকে আরও গভীর করে তোলে। খেলাধুলার মাধ্যমে সুস্থ দেহ, সুস্থ মন ও ইতিবাচক জীবনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে দর্শকদের মাঝে।
ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টে বালক ও বালিকা উভয় গ্রুপের অংশগ্রহণ ছিল সমানতালে প্রাণবন্ত। বেলুন দৌড়, দৌড় প্রতিযোগিতা, সৃজনশীল সাজসজ্জা ও অন্যান্য খেলায় শিক্ষার্থীরা যে আন্তরিকতা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা প্রদর্শন করেছে, তা তাদের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তার সাক্ষ্য বহন করে। জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অংশগ্রহণের আনন্দ ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতাই ছিল এই আয়োজনের মূল সুর।
বিকেলে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক পর্বে গান, নৃত্য ও অভিনয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিভা দর্শকদের মুগ্ধ করে। দেশাত্মবোধক গান, একক অভিনয় ও জনপ্রিয় গানের পরিবেশনা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন মাত্রা দেয়। নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত নৃত্য ও সংগীত ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ, যা দর্শকদের দীর্ঘ সময় আবিষ্ট করে রাখে।
সমাপনীতে পুরস্কার বিতরণীর মাধ্যমে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। শিক্ষার্থীদের চোখে ছিল আনন্দের ঝিলিক, অভিভাবকদের মুখে ছিল গর্বের হাসি, আর শিক্ষকদের হৃদয়ে ছিল পরিশ্রমের স্বীকৃতির প্রশান্তি। অতিথিবৃন্দ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য প্রদান করে ভবিষ্যতে পড়াশোনা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চায় আরও মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান।
সমগ্র আয়োজনের প্রতিটি স্তরে নারী ও শিশু শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীল উপস্থিতি প্রমাণ করে, আগামী দিনের নেতৃত্ব, সংস্কৃতি ও সমাজ গঠনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
ক্রীড়া ও সংস্কৃতির সম্মিলনে রাজার বাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এই আয়োজন শুধু একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান নয়, বরং সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রতকরণ এবং নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন গড়ে তোলার এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস—
দ.ক.সিআর.২৬