মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম: হবিগঞ্জ জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লিলা ভূমি, পাহাড় টিলা আর চা বাগান ঘেড়া বৃহৎ উপজেলা চুনারুঘাট। চুনারুঘাটের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড নিয়ে লেখার পর ইচ্ছে ছিল ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে লেখার। ইতিমধ্যে মোস্তফা মোরশেদের লেখা ❝আমার দেখা চুনারুঘাটের ক্রিকেট❞ দৈনিক কালনেত্র-তে প্রকাশিত হওয়ার পর এ লেখাটি লিখতে পূনরুজ্জীবিত করেছে।

◾সম্ভবত পাকিস্তান আমলেই চুনারুঘাটে ভলিবল খেলার প্রচলন হয়। খেলাটি আমি চুনারুঘাট সিও অফিসের মাঠে প্রথম দেখেছি ১৯৭৭/৭৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে। আবছা স্মৃতিতে মনে পড়ে শীতের আগমনের সাথে সাথে কোর্ট কাটা হত, নেট টাঙানো হত। দুপুর থেকেই ছোটদের দখলে থাকত, বিকেল হলেই বড়রা জড়ো হতেন। আমরা সাইড লাইনে বসতাম আর অপেক্ষায় থাকতাম বলটি কখন দূরে চলে যাবে, বলটি ছুঁয়ার উদগ্র বাসনা নিয়ে বলের পেছনে ছুটতাম। প্রথম দিকে যাঁদের খেলা দেখেছি থানার বিভিন্ন কর্মকর্তা, ইনতাজ স্যার, সামাদ স্যার, ডাক্তার নূরুল ইসলাম, আব্দুল খালেক কমান্ডার, কালাম চেয়ারম্যান, কাদির চেয়ারম্যান, আনিসুর রহমান, মুসলিম উল্লা, কমরেড আরজু, মুক্তিযুদ্ধা আব্দুস সামাদ, শহীদ ভূইয়া, দিলিপ পাল, প্রদীপ পাল, নূরুল ইসলাম তোতা, ফারুক চৌধুরী, হাফিজ উজ জামান বাদল, ফারুক মিয়া, বাবুুল ভাই প্রমূখ।
বাবুল ভাই খুবই লম্বা ছিলেন। তাঁর অসাধারণ স্মেস ছিল দারুণ শৈল্পিক। তিনি আনসার ও ভিডিপির অফিসার পদে নিযুক্ত হলে ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবে কানাডাতে খেলতে গিয়ে সেখানেই সেটেল্ড হয়েছিলেন। ধারণা করা যায় তাঁরাই ছিলেন চুনারুঘাটে ভলিবল খেলার ভ্যানগার্ড।
পরবর্তীতে ছিলেন আনোয়ার আলী, কামরুল হাসান রতন, ফুটবলার কাইয়ুম, নাজিম উদ্দীন শামসু, দিদার, সিদ্দিক আলী মীর, আবু তাহের, তাউস চৌধুরী, আবুল খায়ের, জুয়েল ভাই ও মুকুল ভাই (বাবুল ভাইয়ের ছোট ভাইদ্বয় তাঁদের পিতা ছিলেন থানার অবসরপ্রাপ্ত জমাদার) সুবীর পাল, প্রণয় পাল, শহিদুল ইসলাম শামীম, আসীম দেব, কাজল ভাই, পরেশ ভট্টাচার্য, শংকর দেব, নজরুল ইসলাম, সুবির দেব, মানিক চৌধুরী, আব্দুল হাই, সজল দাস প্রমুখ।

সেসময় আমরা খেলা শুরুর আগে বল নিয়ে ছুটাছুটি করতাম। এদের পর মাঠে ভলিবল খেলায় নেতৃত্ব দিতেন সালেহ উদ্দীন, আব্দুল মান্নান, মোক্তাদির চৌধুরী, চন্দন বর্মন, রফিকুল ইসলাম সোহেল, বিদ্যুৎ পাল, সফিকুল ইসলাম, সফর আলী মীর, সিরাজ আলী মীর, আব্দুল হাই কোকিল, মিথুন দেব, দেবেশ ভট্টাচার্য, আব্দুল হাই, ফারুক নেওয়াজ খান সুমন, নারায়ন শর্মা, সুপ্রিয় পাল, প্রদিপ দাস, আব্দুস সালাম, মিহির দেব প্রমূখ। তখন আমরা খেলাতে উঠতাম ঠিকই তবে সিনিয়র এলে নেমে যেতে হত।
এরপর নেতৃত্বে এলেন আব্দুল কদ্দুছ, সাফিউল আলম সাফি, সুদাম পাল, মনিরুল ইসলাম জুয়েল,আলাউদ্দিন, ওমর আলী, আওয়াল প্রমুখ। তখন আমরা প্লেয়ার হিসেবেই থাকতাম। এরপরে আমাদের সময়, সেলিম ভাই (পিআইওর ছেলে) আব্দুল হান্নান, সৈয়দ ফয়সল আহমদ, আব্দুল মুনিম সোহেল, মহিউদ্দিন তুষার, আনোয়ার হোসেন বিপ্লব, নূরুন্নবী জুয়েল, নুরুজ্জামান রুহেল, তৌফিক বক্স লিপন, হেলাল আহম্মেদ, আল আমিন রিপন, শাহজাহান, কাইয়ুম, জাহিদুল হক, সিরাজ সেলিম, সেলিম খান, সামসু, পার্থ পাল, আজিজুর রহমান কাজল প্রমুখ।
চুনারঘাটে ভলিবল খেলা প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে যাদের নেতৃত্বে যাত্রা করছিল তারা হল, সৈয়দ আফজাল আহমদ সোহেল, মোস্তাফিজুর রহমান রিপন, আতাউর রহমান, অঞ্জন দেব, ফখরুদ্দিন আবদাল, আফসার চৌধুরী, আশরাফুল ইসলাম রাসেল, মোস্তফা মোরশেদ, নোমান প্রমুখ। তারা ভলিবল খেলাটাকে দারুণ উপভোগ্য করে তোলে।
এর পরের ব্যাচ বিশেষ করে নাসির উদ্দীন, সাইফুল ইসলাম জার্নাল, মানবেন্দ্র দেব লিটন, রঞ্জন দেব এদের সময়ও ভলিবল খেলার ধারাবাহিকতা ছিল।বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ভলিবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। একবার আমরাও পুরস্কার পেয়েছিলাম। ট্রফিটি আমাদের বাসায় এখনো আছে। আশির দশকে জাগ্রত সংসদ ও উদয়ন ক্লাবের মধ্যে ম্যাচ হত। চুনারুঘাট ভলিবল দল জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেছে। বর্তমানে জাতীয় দলের খেলোয়াড় সাদ্দাম আহমেদ জাতীয় ভলিবল ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক। আমি যতদূর দেখেছি ও জানি চুনারুঘাটের ভলিবল খেলাটিকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে ফখরুদ্দীন আবদসলের অবদান অনস্বীকার্য।

আমরা যখন উচ্চ শিক্ষা ও পেশার কারণে বাইরে চলে গেলাম তখনও পুরোদমে চুনারুঘাটে ভলিবল খেলাটা চালু ছিল। এবং এ খেলার কারণে অনেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে। জাতীয় দলেও অবদান রেখেছে। এখনো মাঝে মাঝে উপজেলা কমপ্লেক্সে ঘুরতে গেলে দেখি তরুনরা ভলিবল খেলছে তারুণ্যের ঝলকানিতে। রাতের বেলায়ও তারা খেলে ঘাম ঝরাচ্ছে। একদিন এ শহরে যাঁরা এ খেলার বীজ রোপণ করেছিল সেটি এখন মহিরুহ হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে।

লেখাঃ মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম
সহকারী অধ্যাপক
লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজ
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
পদক্ষেপ গণপাঠাগার, চুনারুঘাট