
➖
নিয়াজ মাহমুদ◾
বাংলায় জনপ্রিয় একটি প্রবাদ আছে: সর্বাঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা? প্রবাদটি পুরোপুরি বাস্তবধর্মী। সুইজারল্যান্ডে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে হেনস্তা করার প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক দলগুলো বেশ সোচ্চার। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে থেকে এ কথা শুনতে পাইনি যে, বিদেশের মাটিতে তারা আর কোনো দলের শাখা- প্রশাখা দেখতে চান না! বাংলাদেশি ছাড়া বিদেশের মাটিতে অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক দলের কোনো শাখা- প্রশাখা নেই। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এ ঘটনা নিয়ে আলোকপাত করতে চাই। পাশাপাশি এ লেখার মাধ্যমে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রবাসী শাখা বা কমিটি নিয়ে অপ্রিয় ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে চাই।
নির্বাচন কমিশনের ‘রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন-২০২০’ অনুযায়ী, কোনো দলের গঠনতন্ত্রে যদি দেশের ভৌগোলিক সীমার বাইরে কোনো দফতর, শাখা বা কমিটি গঠন ও পরিচালনার বিধান থাকে তাহলে নির্বাচন কমিশনের ধারা ১১ অনুসারে সেই রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তান ছাড়া বিশ্বের প্রায় ৩০টির মতো দেশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শাখা বা কমিটি আছে। কিন্তু এসব কমিটি গঠন আরপিও’র লঙ্ঘন বিধায় তা গণমাধ্যমে জানানো হয় না। অনেকটা গোপনেই এসব কমিটি করে দলগুলো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরাও প্রবাসে গিয়ে কমিটি গঠন করেন। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাসে কার্যক্রম আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। এ দুটি দলের ৩০টির বেশি দেশে প্রবাস শাখা বা কমিটি রয়েছে। জাতীয় পার্টি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বিকল্পধারা, জাকের পার্টি, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোটের মতো দলগুলোর প্রবাসে শাখা বা কমিটি আছে। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহপ্রায় ১০টির মতো দেশে জাতীয় পার্টির কমিটি আছে। আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি)র মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বেশকিছু দেশে এবি পার্টির সাংগঠনিক কমিটি আছে।
২০২২ সালে অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরের বিরোধের সূত্রপাত হয় গণ অধিকার পরিষদের প্রবাসী শাখার কমিটি গঠন নিয়ে। গণ অধিকার পরিষদে এখন আর রেজা কিবরিয়া নেই। তবে দলটি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কমিটি গঠন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপি,আওয়ামী লীগ জাসদসহ আরো কিছু রাজনৈতিক দলের শাখা আছে৷ বাংলাদেশের মতো ভারত, পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক দলের যুক্তরাষ্ট্র শাখা নেই৷
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শাখা সবচেয়ে প্রাচীন এবং শক্তিশালী। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে অবস্থান করায় তাকে কেন্দ্র করে সেখানকার বিএনপি খুবই তৎপর৷ তবে আওয়ামী লীগের তৎপরতাও কোনো অংশে কম নয়।
এক যুক্তরাজ্য প্রবাসী জানান, ‘‘আসলে যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই সবচেয়ে বেশি তৎপর। ইউরোপ ও অ্যামেরিকার বিভিন্ন দেশ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরবে প্রবাসীদের রাজনীতির প্রতি ঝোঁক বেশি। ইউরোপ, আমেরিকা এবং এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ যেসব দেশে বাংলাদেশি রয়েছেন, তারা নিজেদের জেলা উপজেলার নামে সমিতি যেমন করেন, একইসাথে আওয়ামী লীগ, বিএনপির শাখা গঠন করে দেশের রাজনীতিও সেখানে করেন। ফলে দলাদলি ও বিরোধ লেগেই থাকে।
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, জাপান, কুয়েতসহ বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে দলটির প্রবাস কমিটি আছে। এসব দেশে বসবাসরত বাঙালিরা সেখানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এসব প্রবাস কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে কাউন্সিলর ও ডেলিগেট হিসেবে আমন্ত্রিত হন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল বিদেশের মাটিতে শাখা বা কমিটি গঠন করতে পারবে না। করলে দলের নিবন্ধন বাতিল হবে। তারপরও নানা কৌশলে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত অনেক রাজনৈতিক দল বিদেশে কমিটি গঠন করছে। এসব প্রবাস কমিটির নেতারা বিভিন্ন সময় দেশে এসে রাজনীতি করছেন। সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমপিও নির্বাচিত হচ্ছেন।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ভাঙচুর করা হয়েছিল। পরে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের ছবি ছিঁড়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে যুক্তরাজ্য শাখা আওয়ামী লীগ। বিদেশের মাটিতে বিভিন্ন সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের সময়েও দুদল পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয়। দলীয় প্রধানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একপক্ষ কর্মসূচি দেয়। বিরোধীপক্ষ তার সফরের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দেশ সফর করেন, সেই দেশের প্রবাস কমিটি তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কর্মসূচি পালন করে। অন্যদিকে, বিএনপি তার সফরের প্রতিবাদে কর্মসূচি দেয়। একই অবস্থা লক্ষ করা যায় বিরোধীপক্ষ ক্ষমতায় থাকলে। শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায়।
প্রবাসীরা মনে করেন, যারা বিএনপি – আওয়ামী লীগের প্রবাসে কমিটিতে থাকেন, তাদের উদ্দেশ্য থাকে যে, জীবনের কোনো একসময় দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচন করার। এছাড়া, প্রবাসে বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের নেতা বলে পরিচয় দিতে তারা অনেকটা সম্মান বোধ করেন। অনেক নেতা দলীয় প্রধান বা দলের পেছনে ডোনেটও করেন।
আওয়ামী লীগ দেশের মাটিতে সভা-সমাবেশ করতে না পেরে বিদেশে মাটিতে সোচ্চার হওয়ার চেষ্টা করছে। জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে জেনেভা বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্পটে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে হেনস্তা করার মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, আইনজীবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক – ছাত্রসহ বিভিন্ন সংগঠন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু কেউই এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে মুক্তির কথা বলছে না।
২০২০ সালের ১৮ই জানুয়ারি পর্তুগালে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে ১ জন নিহত হয়। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে লিসবনের বাংলা মার্কেটখ্যাত মার্টিম মনিজে এ ঘটনা ঘটে। দা-চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় দুই দল। স্থানীয় সূত্রের বরাত অনুযায়ী, পূর্বশত্রুতার জের ধরে পর্তুগাল বিএনপি সভাপতি অলিউর রহমান চৌধুরী ও পর্তুগাল আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফরহাদ মিয়ার নেতৃত্বে দুই দলের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে নিহত হয় ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগ কর্মী সাহেদ (৩৮)। আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফরহাদ মিয়ার বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার পশ্চিম কৈলোনপুর ইউনিয়নে এবং বিএনপি’র সভাপতি অলিউর রহমানের বাড়ি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নে। এভাবেই ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য দেশে দেশে এখন বাংলাদেশিদের শত্রু বাংলাদেশিরা। এতে করে বিদেশের মাটিতে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের।
এসব ব্যানার সর্বস্ব রাজনীতি এমনটা মনে করেন ফরাসি নাগরিক কল্যান মিত্র বড়ুয়া। তার প্রশ্ন- এই রাজনীতি দেশের জন্য কী সুফল বয়ে আনবে? তিনি মনে করেন, যে যে দেশে অবস্থান করেন, সেখানকার মূল ধারার রাজনীতি করার মতো যোগ্যতা না থাকায় এভাবেই কমিউনিটিতে নিজেদেরকে হয়তো উপস্থাপন করতে চান।
মাইগ্রেন্টওয়াচ মনে করে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশে দেশে প্রবাসীরা কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে অংশগ্রহণ করেননি। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণ করেছেন।
নিয়াজ মাহমুদ, সম্পাদক, মাইগ্রেন্টওয়াচ ডট নেট
দ.ক.সিআর.২৪